জন্মদিন এলে আনন্দ বা উদযাপনের চেয়ে অসমাপ্ত কাজের হিসাবটাই বেশি মনে করিয়ে দেয় জনপ্রিয় উপস্থাপক, নির্মাতা ও লেখক হানিফ সংকেতকে। জীবন থেকে একটি বছর ঝরে যাওয়ার বিষাদ ছুঁয়ে যায় তাঁকে, মনে পড়ে কত কাজ এখনো করা বাকি। আজ শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দর্শকদের মাতিয়ে রাখা এই গুণী ব্যক্তিত্বের ৬৮তম জন্মদিন। ১৯৫৮ সালের এই দিনে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বিশেষ এই দিনে বড় কোনো জমকালো আয়োজনের চেয়ে পরিবার—স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের সান্নিধ্য এবং ভক্ত-দর্শকদের ভালোবাসাকেই বড় প্রাপ্তি মনে করেন তিনি।
টেলিভিশনের পর্দায় হানিফ সংকেতের পথচলা শুরু হয়েছিল বরেণ্য সাংবাদিক ও উপস্থাপক ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। ফজলে লোহানীকে তিনি কেবল পেশাগত শিক্ষক নয়, বরং বন্ধু ও অভিভাবক হিসেবে গণ্য করতেন। প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লোহানী সম্পর্কে হানিফ সংকেত বলেছিলেন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের টিভি সাংবাদিকতার জনক ও প্রথম সুপারস্টার। তাঁর সান্নিধ্যে থেকেই অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, লেখালেখি, উপস্থাপনা ও দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের কৌশল শেখেন তিনি। ১৯৮৫ সালে ফজলে লোহানীর প্রয়াণের পর ‘ঝলক’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একক উপস্থাপক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন হানিফ সংকেত। এরপর ১৯৮৭ সালে আসেন ‘কথার কথা’ নিয়ে।
পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সম্প্রচার শুরু হয় তাঁর কালজয়ী ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র। চার দশক ধরে বিটিভি থেকে শুরু করে বর্তমান ডিজিটাল যুগের ইউটিউব কিংবা ফেসবুক প্ল্যাটফর্মের প্রতিযোগিতার মধ্যেও এটি দর্শকের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। উপস্থাপনায় নিজস্ব ছন্দ, স্পষ্ট উচ্চারণ, পরিমিত রসবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে হানিফ সংকেত ‘ইত্যাদি’কে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। অশ্লীলতা বা বিদ্বেষহীন এই পারিবারিক বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে শুধু সামাজিক অসংগতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যঙ্গই করা হয় না, বরং আড়ালে থাকা ভালো মানুষদের আলোয় নিয়ে আসা হয়।
স্টুডিওর সীমানা পেরিয়ে নব্বইয়ের দশক থেকে দেশের নানা প্রান্তের ঐতিহাসিক স্থান, নদীর তীর বা প্রাচীন জনপদে ‘ইত্যাদি’র মঞ্চ নির্মাণের সংস্কৃতি গড়ে তোলেন হানিফ সংকেত। প্রতিটি পর্ব ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট জেলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে নিবিড় গবেষণা ও সরেজমিন পরিদর্শন করেন তিনি। পলান সরকার, তালগাছ রোপণকারী গহের আলী, 'ভালো কাজের হোটেল' কিংবা কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ভাসমান স্কুলের মতো অসংখ্য লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা উদ্যোগ ও মানুষকে দেশের সামনে তুলে ধরেছে ‘ইত্যাদি’। তাঁর মিরপুরের প্রতিষ্ঠান ‘ফাগুন অডিও ভিশন’-এর কার্যালয়েও রয়েছে সাহিত্য-সংস্কৃতির সমৃদ্ধ সংগ্রাহশালা, যেখানে নিবিড় শৃঙ্খলার ছাপ দেখা যায়।
একাধারে উপস্থাপক, পরিচালক, লেখক, প্রযোজক, সুরকার, গীতিকার ও গায়ক হিসেবে হানিফ সংকেতের খ্যাতি রয়েছে। ‘ইত্যাদি’র আঞ্চলিক গানগুলোর সুর দেওয়া ও তাতে কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি নাটক নির্মাণ ও অভিনয়েও তিনি সুপরিচিত। তাঁর নির্দেশিত জনপ্রিয় নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘আয় ফিরে তোর প্রাণের বারান্দায়’, ‘দুর্ঘটনা’, ‘তোষামোদে খোশ আমোদে’, ‘কিংকর্তব্য’ ও ‘শেষে এসে অবশেষে’। এছাড়া সাহিত্য অঙ্গনেও তাঁর পদচারণা স্পষ্ট। রম্যরচনা ও সমসাময়িক কলামের পাশাপাশি তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘চৌচাপটে’, ‘এপিঠ ওপিঠ’, ‘ধন্যবাদ’, ‘অকাণ্ড কাণ্ড’, ‘খবরে প্রকাশ’ এবং ‘প্রতি ও ইতি’।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ‘ভিউ’ বা ‘ভাইরাল’ হওয়ার প্রতিযোগিতাকে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি মানতে নারাজ এই বিশিষ্ট নির্মাতা। তাঁর মতে, ভিউ মানেই কিন্তু মান নয়। সাময়িক শোরগোল সৃষ্টির চেয়ে দর্শকের মনে স্থায়িত্ব লাভ করা এবং কাজের সামাজিক প্রভাবই আসল। কোয়ান্টিটির চেয়ে কোয়ালিটিতে বিশ্বাসী হানিফ সংকেত প্রতিটি পর্বের গুণগত মান ও সংরক্ষিত তথ্যসম্ভারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন।
দীর্ঘ বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে বহু স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েছেন হানিফ সংকেত। ২০১০ সালে তিনি পান একুশে পদক। এছাড়া জাতীয় পরিবেশ পদক এবং বহুবার মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য চলতি বছর তিনি লাভ করেছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬’। তবে সব স্বীকৃতির মাঝেও দর্শকের ভালোবাসাকেই শ্রেষ্ঠ পুরস্কার মনে করেন তিনি। জীবনের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা কিছুটা তাড়া করলেও, দর্শক যতদিন চাইবেন এবং নিজের সক্ষমতা থাকবে, ততদিন ‘ইত্যাদি’ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এই গুণী শিল্পী।





