পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শিল্পে অস্থিরতা ও সহিংসতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা প্রয়োগ করে কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন তৈরি পোশাক খাতের মালিকেরা। রোববার রাজধানীর বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে চলমান শ্রম অসন্তোষ নিয়ে সংগঠনের সদস্যদের জরুরি বৈঠক শেষে এই হুঁশিয়ারির কথা জানান বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সম্প্রতি ছয় সদস্যের একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। সরকার বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করার দিনই মালিকপক্ষ থেকে কারখানা বন্ধের এই কড়া বার্তা দেওয়া হলো। বৈঠকের পর বিজিএমইএ সভাপতি জানান, মজুরি বৃদ্ধির দাবি ঘিরে আন্দোলনের কারণে কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা নিয়ে বিজিএমইএর সদস্যরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সকালে কারখানা চালু করা হলেও মাত্র এক ঘণ্টার মাথায় তা আবার বন্ধ করে দিতে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।
জরুরি এই বৈঠকে বিজিএমইএর প্রায় ২৩৫ জন সদস্য অংশ নেন, যারা প্রতিনিধিত্ব করছেন অন্তত ৬০০ থেকে ৭০০টি তৈরি পোশাক কারখানার। বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শ্রমিক সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিক বা কারখানার মালিক—যে পক্ষই সহিংসতায় জড়াবে বা আইন নিজের হাতে তুলে নেবে, তার বিরুদ্ধে যেন কোনো বৈষম্য ছাড়াই কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা হয়, সে বিষয়ে বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
শিল্পে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে একটি বিশেষ প্রস্তাব তুলে ধরেন বিজিএমইএ সভাপতি। তিনি বলেন, নবগঠিত মজুরি বোর্ডের সব সদস্য যেন যৌথভাবে সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে একটি বক্তব্য দেন এবং বোর্ডের কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিক ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে শ্রমিক, শিল্প ও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির কথা বিবেচনা করে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য বোর্ডকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি। শিল্পসংশ্লিষ্ট সুত্র থেকে জানা গেছে, চলমান অসন্তোষ ও সহিংস পরিস্থিতি ঘিরে আশুলিয়া, গাজীপুর ও মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ইতোমধ্যে প্রায় ৫২৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ রয়েছে।
এদিকে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের আরেক শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। রোববার এক বিবৃতিতে সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের ওপর সৃষ্ট চাপ মালিকপক্ষ অনুধাবন করতে পারে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানি সংকট, প্রতিনিয়ত উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদেশে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার যে বাস্তব চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, তা-ও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ফলে কারখানার উৎপাদন সচল রাখা এবং শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা—দুটি বিষয়ই সমান গুরুত্ব বহন করে।
মজুরি বোর্ডে সরকার, মালিক ও শ্রমিক—তিন পক্ষের প্রতিনিধি থাকার কথা উল্লেখ করে বিকেএমইএ সভাপতি আশা প্রকাশ করেন যে আলোচনার মাধ্যমেই একটি বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো নির্ধারণ সম্ভব হবে। এমন একটি মজুরি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা একদিকে শ্রমিকের মানসম্মত জীবনযাপন সুরক্ষিত করবে এবং অন্যদিকে তৈরি পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করবে।





