বাইন্যান্সের ক্রিপ্টো চুরি: বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে উত্তর কোরিয়ার নতুন কৌশল

Published: October 31, 2026, 3:22 pm

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট এবং প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশের সীমাবদ্ধতার মুখে উত্তর কোরিয়া আয়ের বিকল্প পথ হিসেবে সাইবার অপরাধকে বেছে নিয়েছে। দেশটি হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি এবং বিদেশে ভুয়া পরিচয়ে তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী পাঠানোর মতো কৌশল অবলম্বন করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করছে। রয়টার্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থের বড় একটি অংশ দেশটির পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সর্বশেষ চীনভিত্তিক বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি সম্পদ চুরির ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চেইনঅ্যানালাইসিসের হিসাবমতে, ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা অন্তত ২০০ কোটি ২০ লাখ ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫১ শতাংশ বেশি। সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাদের চুরি করা ক্রিপ্টো সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অন্তত ৬৭৫ কোটি ডলারে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, হ্যাকাররা এখন আর ছোটখাটো চুরিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বড় ধরনের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে।

চুরি করা এই ডিজিটাল সম্পদ প্রচলিত মুদ্রায় রূপান্তর করা হ্যাকারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য তারা ডিজিটাল ওয়ালেট, বিভিন্ন ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক এবং অর্থ পাচারের মধ্যস্থতাকারী নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের গঠিত বহুপক্ষীয় নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দল (এমএসএমটি) ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, চীন, রাশিয়া, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যস্থতাকারীদের সহায়তায় উত্তর কোরিয়া এই পাচার কাজ পরিচালনা করে। বিশেষ করে চীনের ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) ব্যবসায়ীদের ওপর তাদের নির্ভরতা বেশি এবং অন্তত ১৫টি চীনা ব্যাংক এই অর্থ পাচারে ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) ২০২৬ সালের মার্চের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চুরি করা ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রথমে একাধিক ডিজিটাল ওয়ালেটে স্থানান্তর করা হয়। এরপর বিভিন্ন ক্রিপ্টো বিনিময়ব্যবস্থা ও ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অর্থের উৎস আড়াল করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রিপ্টো মিক্সার ব্যবহারের মাধ্যমে লেনদেন একত্র করে আবার ভাগ করা হয়। শেষ পর্যায়ে তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতাকারীদের সহায়তায় তা ডলার বা অন্য প্রচলিত বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করা হয়।

সাইবার অপরাধের এই কর্মকাণ্ড বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এর সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সাইবার ইউনিট, বিশেষ করে ‘লাজারাস গ্রুপ’ জড়িত বলে বিভিন্ন দেশের তদন্তে উঠে এসেছে। তারা বিভিন্ন ডিজিটাল প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত ওয়ালেট লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিট থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ইথেরিয়াম চুরির ঘটনায়ও তাদের দায়ী করা হয়। হ্যাকাররা কর্মীদের ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, ক্ষতিকর সফটওয়্যার বা পরিচয় জালিয়াতির মাধ্যমে নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রবেশ করে থাকে।

ক্রিপ্টো চুরির পাশাপাশি বিদেশে তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী পাঠিয়েও দেশটি বড় অংকের অর্থ আয় করছে। এমএসএমটির ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে প্রায় দুই হাজার উত্তর কোরীয় কর্মীর তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের ১২ মার্চ এ ধরনের কর্মীদের আয় ও অর্থ স্থানান্তরে সহায়তার অভিযোগে ছয় ব্যক্তি ও দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়। চেইনঅ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এসব কর্মীর প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড থেকে উত্তর কোরিয়া প্রায় ৮০ কোটি ডলার আয় করেছে বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষের ধারণা। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের একটি শক্তিশালী পথ তৈরি করেছে উত্তর কোরিয়া।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo