শিক্ষায় বরাদ্দ ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে ফ্রান্সে সোয়া লাখ মানুষের বিক্ষোভ

Published: October 24, 2026, 4:49 pm

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সে এক লাখের বেশি মানুষ রাজপথে নেমে বড় ধরনের বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। শনিবার অনুষ্ঠিত এই দেশব্যাপী আন্দোলনের কারণে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার চরম রাজনৈতিক চাপে পড়েছে। মিছিলের শেষভাগে পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজধানী প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের ওপর টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে পুলিশ।

শনিবারের এই বিক্ষোভে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। প্যারিসের কেন্দ্রীয় অঞ্চল এড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নির্ধারিত পথে মিছিলটি পরিচালিত হয়। তবে চলাচলে নানা বিধিনিষেধ ও নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক আন্দোলনকারী এতে সমবেত হন। প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর জানিয়েছে, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগে শনিবারের বিক্ষোভ থেকে ৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৪০ জনকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং গ্রেপ্তারদের মধ্যে ছয়জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। প্রধানত অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহ এবং সহিংসতা বা সম্পত্তি বিনষ্টের প্রস্তুতি নেওয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাঁদের আটক করা হয়।

বিক্ষোভের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে ফ্রান্সের অন্যান্য শহরেও। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, লিওঁ, ক্লেরমঁ-ফেরাঁ ও স্ত্রাসবুর্গ শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। অন্যদিকে নিস ও নঁতে শহরে জলকামান ব্যবহার করা হয়। মার্সেই শহরের মিছিলের শেষভাগে কয়েক ডজন আন্দোলনকারীর সঙ্গে পুলিশের হাতাহাতির ঘটনা ঘটলে সেখানেও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। মার্সেইতে পুলিশ বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ১৭ হাজার বললেও শ্রমিক সংগঠন সিজিটি দাবি করেছে সেখানে এক লাখ মানুষ অংশ নেন। এ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তুলুজ শহরে কর্তৃপক্ষের হিসাবে ২৬ হাজার ৫০০ জন বিক্ষোভে অংশ নেন। তবে লিওঁ, নিস ও মন্টপেলিয়েসহ কয়েকটি শহরে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছিল প্রশাসন, যা সংবিধানস্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে সমালোচনা করেছে শ্রমিক সংগঠনগুলো।

একই দিনে প্যারিসের দক্ষিণে ওর্লেয়াঁ শহরে হাজার হাজার মানুষ কট্টর ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করেন। সে সময় শহরটিতে দুই দিনব্যাপী সম্মেলন করছিল মেরিন লো পেনের দল ন্যাশনাল র‍্যালি। আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এই আন্দোলন ম্যাক্রোঁর জন্য বড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালি দল ইতিমধ্যেই সরকারের বিরুদ্ধে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে ভোটারদের ব্যালটের মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে। ২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বর্তমানে সর্বনিম্ন জনপ্রিয়তার মুখে পড়েছেন।

এই আন্দোলন মোকাবিলার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ দেশজুড়ে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছিলেন। পাশাপাশি সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার ও জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তবে গত সপ্তাহের বিক্ষোভে কয়েকটি শহরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছিল বলে স্বীকার করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ তা প্রত্যাখ্যান করেন। নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে শনিবার প্যারিসের ল্যুভর, ওর্সে জাদুঘর, পিকাসো জাদুঘর এবং বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পল সেজানের বড় প্রদর্শনী চলা গ্রঁ পালে বন্ধ রাখা হয়। এমনকি আন্তর্জাতিক সমকালীন শিল্পকর্মের প্রদর্শনী আর্ট বাসেল শুক্রবার খুললেও অস্থিরতার শঙ্কায় সপ্তাহান্তের কর্মসূচি বাতিল করা হয়।

চলতি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল গত মাসে প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে কর্মীসংকটের প্রতিবাদে। পরবর্তীতে তা দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ে উন্নত শিক্ষার পরিবেশের দাবি এবং কর্মীরা উন্নত মজুরি ও পেনশনের দাবিতে এতে যোগ দেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ফ্রান্সের সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক অনুপস্থিতির কারণে ১ কোটি ৫৪ লাখ ঘণ্টার পাঠদান ব্যাহত হয়েছে। বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ না দিতে পারায় নির্ধারিত পাঠদানের ৭.৫ শতাংশ সম্পাদন করা সম্ভব হয়নি।

বিক্ষোভের লাগাম টানতে শুক্রবার উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। বৈঠকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কর্মসূচি চলবে। যৌথ ১০ দফা দাবিতে তাঁরা আরও শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো সংস্কার, শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক ভাতা ২০০ ইউরো বৃদ্ধি এবং সরকারি ছাত্রাবাসের ভাড়া স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন। প্যারিসের বিক্ষোভকারী লুই লেদু-জাতার বলেন, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈষম্যমূলক সমাজে পরিণত হতে চান না, যেখানে সমাজের এক শ্রেণির হাতে সব থাকবে আর অন্যরা বঞ্চিত থাকবে।

এদিকে বিক্ষোভ দমাতে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের সমালোচনা করছেন আন্দোলনকারীরা। শুক্রবার পুলিশ প্যারিসের নির্ধারিত মিছিলে রুট পরিবর্তন করে এবং সাবেক শুরুর স্থান বাস্তিল চত্বরে উপস্থিত লোকজনকে মাইক বাজিয়ে সরে যেতে বলা হয়; অন্যথায় ১৩৫ ইউরো জরিমানার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ৫৮ বছর বয়সী নার্স সৌমায়া আবেদ বলেন, তিনি কখনোই পোর্ত দ্য ইতালি থেকে মিছিল শুরু হতে দেখেননি। তাঁর মতে, গত সপ্তাহের ঘটনাকে অজুহাত করে সরকার আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশ উন্নত করার শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এভাবে বন্ধ করা যাবে না। এরই মধ্যে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের উদ্যোক্তারা বিক্ষোভ করার অধিকার রক্ষার দাবিতে আগামী ৩১ অক্টোবর নতুন করে আবারও রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছেন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin