শিক্ষা খাতের অব্যবস্থাপনায় জিম্মি শিক্ষার্থীরা, দায় নেবে কে?

Published: November 5, 2026, 2:47 am

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বহুমাত্রিক নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে, যার ফলে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা বছরের পর বছর ধরে অপূরণীয় খেসারত দিয়ে আসছেন। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে শিক্ষা খাতে যে মৌলিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। বরং সর্বশেষ এইচএসসি পরীক্ষার কঠোর মূল্যায়ন ও অব্যবস্থাপনার কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবনে ফেল করার কলঙ্ক নেমে এসেছে।

শেখ হাসিনার শাসনামলে পাবলিক পরীক্ষাকে তামাশায় রূপান্তর করা হয়েছিল, যেখানে প্রশ্ন ফাঁস ও গণহারে জিপিএ ৫ প্রাপ্তি ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। ২০২১ সালে পাসের হার ৯৫ শতাংশ ও ১ লাখ ৮৯ হাজার জিপিএ ৫ এবং ২০২২ সালে ৮৬ শতাংশ পাসের হার ও ১ লাখ ৭৬ হাজার জিপিএ ৫ প্রাপ্তির চিত্রই তার প্রমাণ। তবে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ১২ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় অর্ধেক বা ৫ লাখ ৯৪ হাজার শিক্ষার্থীই ফেল করেছেন। গড় পাসের হার ৫২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জিপিএ ৫ পেয়েছেন মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী।

শিক্ষা খাতের এই নৈরাজ্য নতুন নয়। আগস্টে প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলেও দেখা গেছে, পুনর্মূল্যায়নের আবেদনের পর তিন হাজার শিক্ষার্থী নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে, যা খাতা মূল্যায়নের চরম অনিয়ম ও অবহেলাকে স্পষ্ট করে। এছাড়া এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে চায়ের দোকানে বসে খাতা মূল্যায়নের ঘটনাও ধরা পড়েছে।

এবারের এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বিতর্কের কারণ অনেক। প্রথমবারের মতো পূর্ণ সিলেবাসে সমন্বিত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, যেখানে বিজ্ঞান বিভাগের প্রশ্ন ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুল ও অসংগতিপূর্ণ। পদার্থবিজ্ঞানে ভুলের কারণে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হলেও, যারা ভুল বুঝতে পেরে উত্তর কেটে অন্য প্রশ্নের উত্তর লিখেছিলেন, তারা ক্ষতির শিকার হয়েছেন। বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তনের দাবি মানা হয়নি, যা শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে।

ফলাফলের এই বিপর্যয়ে দুই লাখ ৯৮ হাজার শিক্ষার্থী এক বিষয়ে এবং চার লাখ ২২ হাজার শিক্ষার্থী দুই বিষয়ে ফেল করেছেন। শিক্ষামন্ত্রী দুই বিষয় পর্যন্ত ফেল করা শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দিলেও, লাখ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন লণ্ডভণ্ড হওয়ার দায়ভার কে নেবে—এমন প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া অনেক শিক্ষার্থী পুনঃপরীক্ষার আগেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারাবেন।

পরীক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার জরুরি। একটি পরীক্ষা জীবনের সফলতা বা ব্যর্থতার মাপকাঠি হতে পারে না। বর্তমান অকার্যকর ও জীর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মেধার অকালমৃত্যু ঘটাচ্ছে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনমুক্ত শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করতে পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে পুরো পরীক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh