রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় মশকনিধনে বিশেষ তৎপরতা শুরু হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ডেঙ্গুর ১০০টি ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২৯টি ওয়ার্ডকে এডিস মশার প্রজনন ও ডেঙ্গুর জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুই সিটিতেই এখন বিশেষ মশকনিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে। ২০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবস পালনের মধ্য দিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধের গুরুত্ব আরও সামনে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ফেলে দেওয়া বোতল, প্লাস্টিকের পাত্র, টায়ার বা অন্যান্য বর্জ্যে জমে থাকা পানিই এডিস মশার প্রধান প্রজননস্থল।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৩৭৯ জনে, যার মধ্যে ১৭৮ জন মারা গেছেন। বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৩১০ এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৪ জনের। তবে আগস্টে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়; সে মাসে এক লাফেই আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৮৪৬ জনে এবং ৯৭ জনের মৃত্যু হয়। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত ২৪ হাজার ৫৩৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৮১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদদের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের শুরু হতে পারে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য ‘পিক’ বা সর্বোচ্চ সংক্রমণের সময়।
ডিএনসিসি সূত্র জানায়, গত ১৫ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের ঠিকানা বিশ্লেষণ করে ১০০টি হটস্পট নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বড় অংশই মিরপুর-পল্লবী-কাফরুল এবং মোহাম্মদপুর-আদাবর-শ্যামলী এলাকায় অবস্থিত। মিরপুরের মিরপুর-২, বড়বাগ, মণিপুর, ৬০ ফিট, মিরপুর-১০, রোকেয়া সরণি, পাইকপাড়া, টোলারবাগ, আহমেদ নগর, দক্ষিণ বিশিল, দক্ষিণ পল্লবী, বাউনিয়াবাদ ও কাফরুলের কাজীপাড়া-শেওড়াপাড়া এই তালিকায় রয়েছে। এছাড়া মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক, পিসি কালচার, শ্যামলী, নবোদয়, বাইতুল আমান হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, বছিলা, কাটাসুর, জাফরাবাদ ও রায়েরবাজারও হটস্পটের অন্তর্ভুক্ত। মহাখালী, বনানী, গুলশান, করাইল, বাড্ডা, রামপুরা, আফতাবনগর, সাতারকুল, ভাটারা, নূরের চালা, দুমনি এবং উত্তরা, খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ, দিয়াবাড়ি, তুরাগ, কামারপাড়া, রাজাবাড়ী, ধউর, দক্ষিণখান ও আশকোনার বিভিন্ন এলাকাও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।
হাসপাতালের ১ হাজার ৬৭৮ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি রোগী মিরপুর এলাকার—৬০৭ জন (৩৬.২%)। এরপর মোহাম্মদপুরে ৩২১ জন (১৯.১%), কচুক্ষেত, ইব্রাহিমপুর ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ১৬৭ জন (৯.৯%), বাউনিয়ায় ১২৭ জন (৭.৬%), কাওলায় ৯৭ জন (৫.৮%), রায়েরবাজারে ৮৯ জন (৫.৪%), দক্ষিণখানে ৮৪ (৫.১%), মহাখালীতে ৮১ (৩.৮%), খিলক্ষেতে ৭৭ (৩.৬%) এবং বসুন্ধরা এলাকায় ২৭ জন (১.৬%) রোগী পাওয়া গেছে। হটস্পটগুলোতে এডিসের লার্ভা ধ্বংসে ডিএনসিসি ‘একশোতে একশো’ কর্মসূচি শুরু করেছে। লালমাটিয়ার নিউ কলোনি আবাসিক এলাকায় (৩২ নম্বর ওয়ার্ড) সম্প্রতি অভিযানে গিয়ে একটি স্যাঁতসেঁতে ঘরের পাশে জমে থাকা পানিতে লার্ভা পান মশককর্মীরা। ওই ওয়ার্ডের ৬৩টি স্থাপনা পরিদর্শন করে ৪২টিতে এবং মোহাম্মদপুরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের ৫১টি স্থাপনার মধ্যে ৩৬টিতে লার্ভা পাওয়া গেছে。
মোহাম্মদপুরের শেখেরটেকের বাসিন্দা ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা টনি চিরান জানান, গত মাসে তাঁর মেয়ে রিব্বনচি রিছিল ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী চিমুক রিছিলও গুরুতর অসুস্থ হন। পরীক্ষায় ডেঙ্গু না ধরা পড়লেও তাঁর প্লাটিলেট ৫০ হাজারের নিচে নেমে যাওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, তাঁদের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে সচেতন করা, যাতে এডিস মশার বংশবিস্তারের পরিবেশ তৈরি না হয়।
can অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১২ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত ২ হাজার ২৫০টি বাড়িতে এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ে একটি যৌথ জরিপ চালায়। এতে ডিএসসিসির ২৯টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো হলো ২, ৪, ৫, ৬, ৭, ৯, ১১, ১৩, ১৫, ১৭, ২০, ২১, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৮, ৩২, ৩৬, ৩৮, ৫২, ৫৫, ৫৬, ৫৭, 6২, ৬৮, ৭০, ৭৩ ও ৭৪ নম্বর ওয়ার্ড। এসব ওয়ার্ডের মধ্যে ধানমন্ডি-কলাবাগান-শুক্রাবাদ, সেগুনবাগিচা-সচিবালয়, শাহবাগ-পরীবাগ-বাংলামোটর, খিলগাঁও-বাসাবো-মুগদা, লালবাগ-আজিমপুর-চকবাজার, পুরান ঢাকার সূত্রাপুর-কোতোয়ালি, যাত্রাবাড়ী-কদমতলী-কামরাঙ্গীরচর এবং ডেমরা-সারুলিয়া-দক্ষিণগাঁও-নন্দীপাড়ার বিভিন্ন এলাকা রয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, বহুতল ভবনে সবচেয়ে বেশি (৩৫.২৩%) লার্ভা পাওয়া গেছে। এছাড়া একক বাড়িতে ২৭.৭৬%, নির্মাণাধীন ভবনে ১৭.৪৪% এবং সেমি পাকা বাড়িতে ১৪.৫৯% লার্ভা মিলেছে। মেঝেতে জমে থাকা পানিতে ১২.২৬%, বালতিতে ১০.৩৪% এবং প্লাস্টিকের ড্রামে ৮.৮৯% লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ডিএসসিসি ‘উফপ’ (উল্টান, ফেলুন, পরিষ্কার করুন) শীর্ষক বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে, যেখানে স্কুল শিক্ষার্থীদের সচেতনতায় জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রতি শনিবার বিশেষ ‘ক্লিনিং ডে’ পালনের মাধ্যমে আবাসিক এলাকা, ছাদ ও পরিত্যক্ত স্থাপনার পানি অপসারণ করা হচ্ছে। ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে আগস্টে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে, তাই সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার মনে করেন, মে মাসের জরিপের তথ্য দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন। বর্তমান অবস্থা বুঝতে রোগী ধরে ধরে নতুন হটস্পট চিহ্নিত করতে হবে এবং লার্ভা ধ্বংসের পাশাপাশি ধোঁয়া দিয়ে উড়ন্ত মশা মারার সমন্বিত কার্যক্রম দ্রুত চালাতে হবে।





