৩ ঘণ্টার হাঁকে ৫ কোটির বিকিকিনি: মাতামুহুরীর চোঁয়ার ফাঁড়ি মাছের বাজার

Published: September 20, 2026, 3:40 am

কক্সবাজারের নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী চোঁয়ার ফাঁড়ি মাছের বাজার। প্রতিদিন ভোর হতে না হতেই এই বাজারে শুরু হয় তীব্র ব্যস্ততা। সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৯টা—মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত সময়ে এখানে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত থাকে এই বাজার। এখান থেকে মাছ চলে যায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

প্রতিদিন সকাল পৌনে ছয়টার দিকে বাজারসংলগ্ন খাল দিয়ে শতাধিক মাছভর্তি নৌকা ঘাটে ভিড়তে শুরু করে। নৌকা থেকে মাছ নামানোর সাথে সাথেই ভিড় জমান ক্রেতারা। এরপর শুরু হয় দর-কষাকষি ও নিলাম। মাতামুহুরী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল আমিন জানান, চোঁয়ার ফাঁড়ি এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মাছের বাজার। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি চকরিয়ার বাইরের শৌখিন ক্রেতারাও এখানে তাজা মাছ কিনতে আসেন। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ কোটি টাকার মাছ এখানে বিক্রি হয়।

এই বাজারে সাধারণত ইলিশ, কোরাল, বাটা, ট্যাংরা, বাগদা ও গলদাসহ বিভিন্ন জাতের চিংড়ি, দাতিনা, পাঙাশ, রুই, কাতলা, পাবদা, নাইলোটিকা ও মৃগেলসহ নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। বেশির ভাগ মাছে বরফ দেওয়া থাকে না বলে একদম তাজা মাছের জন্য পুরো জেলায় এই বাজারের আলাদা খ্যাতি রয়েছে। বিক্রেতারা কেউ কর্কশিটের বাক্সে, কেউ পাতিলে বা বাটিতে, আবার কেউ পলিথিন ও ঝুড়িতে সাজিয়ে মাছ বিক্রি করেন। অনেকে আড়তের দাঁড়িপাল্লায় মেপে বিক্রি করেন, আবার অনেকে ঝুড়িভর্তি মাছের আনুমানিক দাম ধরে নিলামে তোলেন। সর্বোচ্চ দাম হাঁকানো ক্রেতাই সেই মাছ কিনে নেন।

চট্টগ্রাম নগরের বন্দর এলাকার স্কুলশিক্ষক নুরুল কবির তাঁর দুই বন্ধুকে নিয়ে সোমবার সকালে এই বাজারে এসেছিলেন। তাঁর হাতে ছিল চারটি ইলিশ। তিনি জানান, টাটকা মাছের খোঁজে এখানে আসা। চট্টগ্রামে যে চারটি ইলিশ কিনতে অন্তত সাত হাজার টাকা লাগত, তা এখানে চার হাজার টাকায় পেয়েছেন। তাঁর বন্ধু আইনজীবী সাইফুল ইসলাম ৪ হাজার ৪০০ টাকায় কিনেছেন পাঁচ কেজি বাগদা চিংড়ি। তিনি বলেন, বাজারের বেশির ভাগ মাছই জীবিত এবং চট্টগ্রামের তুলনায় দাম অনেক কম।

বাজারটিতে মোট ২৪টি আড়ত বা পাল্লা রয়েছে। প্রতিটি আড়তে দিনে গড়ে ২০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়, যা সব মিলিয়ে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর বাইরে স্থানীয় জেলেরা আলাদা বসে আরও অন্তত ২০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেন। সব মিলিয়ে দৈনিক বিক্রি প্রায় পাঁচ কোটি টাকা স্পর্শ করে। বাজারে অন্তত ১০০ জন আড়তদার এবং ১৫০ জন কর্মচারী কাজ করেন, যার ফলে এখানে প্রায় ২৫০ জনের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

আড়তদার শাহেদুল ইসলাম (৬০) জানান, তাঁর জন্মের আগে থেকেই এই বাজারে মাছ বিক্রি হচ্ছে। মহেশখালী, চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে জেলেরা এখানে মাছ নিয়ে আসেন। আরেক আড়তদার শওকতুল ইসলাম বলেন, সকাল ছয়টা থেকে বাজার জমে ওঠে এবং সাড়ে নয়টার মধ্যে ফাঁকা হয়ে যায়। আড়তদারেরা মাছ মেপে ও বিক্রি করে দেওয়ার বিনিময়ে প্রতি কেজিতে ১০ টাকা কমিশন পান। মাছ বিক্রেতা মোহাম্মদ বাবুল (৪৫) জানান, তাঁরা জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে আবার বাজারে বিক্রি করেন। মাছের আকার ও ধরন অনুযায়ী প্রতি কেজি ২০০ থেকে ১ হাজার টাকা বা তার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হয়।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের মতে, এই বাজারের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৫০ সালের দিকে উপকূলের জলদাস সম্প্রদায়ের জেলেরা চকরিয়া সুন্দরবন এলাকায় মাছ ধরে চোঁয়ার ফাঁড়ি বাজারে এনে বিক্রি শুরু করেন। পরবর্তীতে মুসলিম জেলেরা এই পেশায় যুক্ত হন। চকরিয়া সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশ ইজারা দিয়ে মাছের ঘের তৈরি শুরু হলে বাজারের প্রসার ঘটে। প্রায় ২০ বছর আগে চকরিয়া উপজেলার চিরিংগা ইউনিয়নের সওদাগরঘোনা ও বুড়িপুকুর এলাকায় মাছের বাজার বসলেও চোঁয়ার ফাঁড়ির জনপ্রিয়তার কাছে সেগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়। উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্যমতে, চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় প্রায় ৪৫ হাজার ৫০০ একর চিংড়ি জোন রয়েছে, যার সিংহভাগ মাছই এই বাজারে আসে। চকরিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মকছুদুল হক (৬০) জানান, পাকিস্তান আমল থেকেই এই বাজারটি চালু রয়েছে।

তবে স্থানীয় জেলেদের মতে, চলতি বছরের জুলাই মাসের বন্যার কারণে এবার মাছের উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে। বন্যায় অনেক ঘেরের বাঁধ ভেঙে মাছ ভেসে গেছে। জেলে মনছুর আলম বলেন, ঘের থেকে মাছ বেরিয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কম এবং খরচ তুলতে এবার মাছের দাম কিছুটা বেশি। ২০ বছর ধরে মাছ বিক্রি করা জেলে আবুল হাশেম (৫০) জানান, এবার ছোট কোরাল ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা এবং বড় কোরাল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ছোট ইলিশ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপসহকারী চিকিৎসা কর্মকর্তা জিয়া উদ্দিন ও কক্সবাজার থেকে বোনের বিয়ের জন্য মাছ কিনতে আসা নবিউল আলম (৩৯) উভয়ই জানান, এবার মাছের দাম কিছুটা বেশি হলেও একদম তরতাজা মাছ পাওয়া যাচ্ছে। নবিউল ৪৫ হাজার টাকায় ৩০ কেজি চিংড়ি এবং ১২ হাজার ৫০০ টাকায় পাঁচটি বড় কোরাল কিনেছেন।

বাজারের এক পাশে বসেন খুচরা বিক্রেতারা, যাঁরা রাতে খাল-বিলে জাল দিয়ে মাছ ধরেন। শৈশব থেকে মাছ ধরা মো. নুরুন্নবী (২৫) প্রতিদিন ২-৩ কেজি মাছ নিয়ে বাজারে আসেন এবং তা বিক্রি করে সংসারের বাজার নিয়ে বাড়ি ফেরেন। তাঁর পাশে বসা ১৩ বছরের কিশোর ফরহাদুল ইসলাম জানায়, আগের রাতে মায়ের সাথে জাল দিয়ে ধরা ২ কেজি ৮০০ গ্রাম মাছ বিক্রি করতে সে বাজারে এসেছে। জেলে মোহাম্মদ কাইছার (২৮) বলেন, মাছের পরিমাণ জো বা জোয়ারের ওপর নির্ভর করে। ভরা পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় বেশি মাছ পাওয়া যায়। প্রতি মাসে দুটি জো হয়ে থাকে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo