ইতালির এক সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা তরুণী থেকে ভারতের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের বধূ—সোনিয়া গান্ধীর জীবনের প্রতিটি বাঁকই যেন ইতিহাসে মোড়ানো। দীর্ঘ এক দশক পর কোনো সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের জীবনের নানা ট্র্যাজিক অধ্যায়, পারিবারিক স্মৃতি এবং ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী। দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক বিরল সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তার মধ্যে এক গভীর আতঙ্ক কাজ করত—পরবর্তী হত্যার শিকার হবেন তার স্বামী রাজীব গান্ধী। ১৯৯১ সালে সেই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত নির্মমভাবে সত্যি হয়েছিল।
৭৯ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক অবশ্য নিজের জীবনকে অসাধারণ কিছু বলে মানতে নারাজ। সাক্ষাৎকারে নিজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, জীবনে এত ঘটনা ঘটেছে যে ষাটের দশকের সেই ইতালীয় তরুণীকে তিনি আর নিজের মাঝে খুঁজে পান না। ইতালির উত্তরাঞ্চলের এক ছোট শহরে জন্ম নেওয়া সোনিয়া ভাষা শিখতে ক্যামব্রিজে গিয়ে একটি গ্রিক রেস্তোরাঁয় রাজীব গান্ধীর সঙ্গে পরিচিত হন। তখন তিনি জানতেনই না যে রাজীব ভারতের বিখ্যাত নেহরু-গান্ধী পরিবারের সন্তান। প্রথম দেখাতেই রাজীবের ব্যক্তিত্ব, মমতা ও ভালোবাসার প্রেমে পড়ে যান তিনি। রাজীবের জন্য নিজের ইতালীয় পরিচয় বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। ১৯৬৮ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ভারতে আসার পর শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। সংবাদপত্রে ইন্দিরাকে যতটা কঠোর নেতা হিসেবে দেখা যেত, পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন আর দশজন সাধারণ মায়ের মতোই। রাজীব তখন বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের পাইলট হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং দুই সন্তান রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে তাদের জীবন স্বাভাবিকভাবেই কাটছিল।
সেই শান্ত জীবনে প্রথম বড় বিপর্যয় নেমে আসে ১৯৮৪ সালে। পাঞ্জাবে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযানের পর দেশজুড়ে প্রবল উত্তেজনা তৈরি হয়। সেখানে বহু শিখ তীর্থযাত্রী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হওয়ার পর ইন্দিরার ওপর প্রাণনাশের হুমকি বাড়তে থাকে। সোনিয়া জানান, ইন্দিরা নিজেই নিজের মৃত্যুর পূর্বাভাস পেয়েছিলেন। এমনকি নাতি রাহুলকে আগে থেকেই শক্ত হতে এবং কান্না না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ওই বছরের ৩১ অক্টোবর দিল্লির বাসভবনে নিজ দেহরক্ষী দুই শিখ জোয়ানের গুলিতে নিহত হন ইন্দিরা। গুলির শব্দ শুনে সোনিয়া দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে রক্তাক্ত শাশুড়িকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। ইন্দিরার লাশ হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই রাজীবকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে বলা হয়, যা সোনিয়ার কাছে ছিল হৃদয়ে ছুরিকাঘাতের মতো।
ইন্দিরা হত্যাকাণ্ডের পর তাদের পারিবারিক জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। বাড়িটি রূপান্তরিত হয় এক সশস্ত্র দুর্গ ও সেনানিবাসে। সন্তানদের শয়নকক্ষ থেকে শুরু করে সর্বত্র কমান্ডো মোতায়েন করা হয়, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাকে বিদ্যালয় থেকে ছাড়িয়ে আনা হয় এবং চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ে। রাজীব রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষ করে নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ি না ফিরলে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাতেন সোনিয়া। রাজীবও চাইতেন সোনিয়া যেন সব সময় তার পাশে থাকেন। সোনিয়ার মনে সব সময় এই একটি ভয়ই ঘুরপাক খেত যে ইন্দিরার পর রাজীবকেই আততায়ীদের লক্ষ্য হতে হবে।
১৯৯১ সালের মে মাসে নির্বাচনি প্রচারণায় গিয়ে শ্রীলঙ্কার তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এলটিটিইর আত্মঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ হারান রাজীব গান্ধী। সেই শোকে ভেঙে পড়া সোনিয়া দিনের পর দিন অন্ধকার ঘরে বসে মোৎসার্টের রেকুইয়েম শুনে সময় কাটাতেন বলে জানান মেয়ে প্রিয়াঙ্কা। বোন তাকে ইতালিতে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানালেও সোনিয়া প্র প্রত্যাখান করেন। তার মতে, ভারতই ছিল তার এবং তার সন্তানদের আসল ঠিকানা। রাজীব হত্যাকাণ্ডের আগে ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে শ্রীলঙ্কা সংক্রান্ত হুমকির তথ্য থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না করে সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা তুলে নিয়েছিল বলে অভিযোগ করেন সোনিয়া। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, রাজীব হত্যাকাণ্ডের পেছনের বড় চক্রান্ত উন্মোচনে গঠিত তদন্ত কমিশনটি নরেন্দ্র মোদি সরকার বন্ধ করে দেওয়ায় প্রকৃত সত্য হয়তো আর কখনোই সামনে আসবে না।
রাজনীতিকে বরাবরই হিংসা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ভণ্ডামির জগত মনে করা সোনিয়া রাজনীতি থেকে দূরেই থাকতে চেয়েছিলেন। তবে ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস যখন চরম ভাঙনের মুখে পড়ে, তখন স্বামীর প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে দলের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। হিন্দি তার তৃতীয় ভাষা হওয়া সত্ত্বেও কঠিন রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে ২০০৪ সালে দলকে ক্ষমতায় ফেরান তিনি। তবে নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে খাপ খায় না জানিয়ে সে সময় প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানান সোনিয়া। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে তার সন্তান রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা সক্রিয় রাজনীতি সামলাচ্ছেন।
সাক্ষাৎকারে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং শাসকদল বিজেপির কঠোর সমালোচনা করেন সোনিয়া গান্ধী। মোদিকে এক কর্তৃত্ববাদী শাসক উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি পরিকল্পিতভাবে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করছে এবং কংগ্রেসের গড়ে তোলা বহুত্ববাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ ধারণার বিপরীতে হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা চাপিয়ে দিয়ে প্রায় ২০ কোটি মুসলমানসহ সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। রাজনীতিতে বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং সংসদে কথা বলতে না দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানান তিনি। একই সঙ্গে মোদি তার সঙ্গে কুশল বিনিময় বা তাকানো পর্যন্ত এড়িয়ে যান বলে অভিযোগ করেন সোনিয়া।
নিজের আসন্ন আত্মজীবনী ‘বিলংগিং’ নিয়েও নানা জটিলতার কথা প্রকাশ করেন এই কংগ্রেস নেত্রী। পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া পাণ্ডুলিপিতে থাকা সরকারবিরোধী সমালোচনা নিয়ে অস্বস্তিতে পড়ে সম্পাদনার শর্ত দিয়েছিল। সোনিয়া তাতে রাজি না হওয়ায় প্রকাশের ঠিক এক সপ্তাহ আগে তারা পিছিয়ে যায়, যদিও পেঙ্গুইন ভিন্ন দাবি করেছে। শেষ পর্যন্ত অন্য প্রকাশনী থেকে বইটি আসছে। দেশে সমালোচনা ও ভিন্নমত প্রকাশের ভীতি এতটাই বেড়েছে যে তার ২৬ বছর বয়সী নাতির একটি শিল্প প্রদর্শনী থেকেও রাজনৈতিক প্রতিবাদের ছবি সরিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। তবে এসব প্রতিকূলতার মাঝেও ব্যাঙ্গালুরুসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তরুণদের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ তাকে আশাবাদী করে তুলছে। বর্তমানে অবসর সময়ে সবজি বাগান, বই পড়া ও সংগীত শুনে সময় কাটালেও রাজীব গান্ধীর স্মৃতি ও বাড়ির চারপাশের কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনী তাকে প্রতিনিয়ত অতীত রক্তক্ষরণের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ইন্দিরা গান্ধী হত্যার পঞ্চম বার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৮৯ সালে রাজীব এবং প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে সোনিয়া গান্ধী।





