ট্রাম্পের দলের ভরাডুবির ৫ কারণ বিশ্লেষণ

Published: November 4, 2026, 4:13 pm

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি ডেমোক্র্যাটদের কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। এই ফলাফলের মাধ্যমে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণও ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে গেছে। যদিও ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে কিছুটা খারাপ ফল করে থাকে, তবে এবারের পরাজয়কে হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের দুই বছরের শাসনের বিরুদ্ধে মার্কিন ভোটারদের জোরালো প্রত্যাখ্যান হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে দলটির এই বিপর্যয়ের পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রথমত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ভোটারদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকাগুলোতে প্রচারের সময় মানুষের সেই অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। নর্থ ক্যারোলাইনার এক ভোটার বিবিসিকে জানান, জ্বালানি ও মুদি পণ্যের ক্রমবর্ধমান দামের কারণে তিনি রিপাবলিকান ছেড়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের দাম ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অক্টোবরের শুরুর দিকে খুচরা ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন প্রায় ৬ ডলার ৫২ সেন্টের রেকর্ড ছুঁয়েছিল। জরিপ অনুযায়ী, প্রতি ১০ জনের মধ্যে আটজন ভোটার জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আর্থিক সংকটে পড়ার কথা জানিয়েছেন এবং এর জন্য অধিকাংশ ভোটার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ সংকট তৈরি হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রল পাম্পগুলোতে জ্বালানির দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়। ভোটারদের জরিপে ৬৩ শতাংশ মানুষ ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে ভুল বলে অভিহিত করেছেন এবং ৭৪ শতাংশ জানিয়েছেন যে, এই যুদ্ধ তাদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় প্রভাবক ছিল। ট্রাম্প নিজেও ফক্স নিউজের সাক্ষাৎকারে পরাজয়ের পেছনে এই যুদ্ধের ভূমিকা স্বীকার করেছেন, যদিও তিনি দাবি করেন যে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া উপায় ছিল না।

তৃতীয়ত, ডেমোক্র্যাটদের সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক প্রচার কৌশল রিপাবলিকানদের চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল। ডেমোক্র্যাটরা স্বাস্থ্যসেবা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর মতো সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। টেক্সাসের জেমস টালারিকো, কানসাসের অ্যাডাম হ্যামিলটন এবং দক্ষিণ ক্যারোলাইনার সাবেক শিশু চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজের মতো প্রার্থীরা ভোটারদের বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করতে পেরেছেন। জর্জিয়ার সিনেটর জন অসফও জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতিকে প্রচারের মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরে জয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো অনেক রিপাবলিকান প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোটারদের উদ্বেগের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

চতুর্থত, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের আকর্ষণ হ্রাস পাওয়া এবং তার একক প্রাধান্য দলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ট্রাম্প নিজে প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর হাতিয়ার হতে চেয়ে ভোটারদের তার নিজের নাম ব্যালটে কল্পনা করতে বলেছিলেন। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের ক্ষোভ বাড়তে থাকা অবস্থায় প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে রাখা ছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত। নির্বাচনের আগের শেষ ভাষণেও তিনি দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে কথা বলার পরিবর্তে রিফ্লেক্টিং পুলের বিতর্কিত সংস্কার প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করেন। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় অনেক অঙ্গরাজ্য রিপাবলিকানদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পঞ্চমত, হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনে বড় ধরনের পরিবর্তন রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পথ প্রশস্ত করেছে। দুই বছর আগে ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া অনেক হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকেছেন। বিশেষ করে অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইসের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী এলাকায় এবং কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের জয় এই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। মিসিসিপির সিনেট নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী স্কট কলমের জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা ১৯৮২ সালের পর প্রথমবারের মতো কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জর্জিয়া থেকে পুনর্নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফও জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতিকে প্রচারের মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। ৩৯ বছর বয়সী এই নেতার জয় বেশ স্বস্তিদায়ক ব্যবধানে হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যটিতে ট্রাম্প জয়ী হয়েছিলেন। ফলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অসফের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হতে পারে।

এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বা অনুমোদনের হার কমেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাকে সমর্থন করা কয়েকটি অঙ্গরাজ্যও এ কারণে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Alokito Bangladesh