আধুনিক জ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করেছিল বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ

Published: October 31, 2026, 8:10 am

ইসলামি স্বর্ণযুগে আব্বাসি খেলাফত আমলে বাগদাদ কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্র ছিল না, বরং তা পরিণত হয়েছিল বিশ্ব জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্রে। প্রাচীন জ্ঞান সংরক্ষণ ও বিকাশের মাধ্যমে বৈশ্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রাকে তরান্বিত করতে অনন্য অবদান রেখেছিল বাগদাদের বিখ্যাত লাইব্রেরি ‘বায়তুল হিকমাহ’ (হাউস অব উইজডম)। গ্রিক, ফারসি ও ভারতীয় সভ্যতার বিশাল জ্ঞানভান্ডারের সঙ্গে আরবিভাষী পণ্ডিতদের মেলবন্ধন ঘটানোর পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞানচর্চার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি।

বাইতুল হিকমাহর সংগ্রহের গোড়াপত্তন ও সমৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল খলিফা হারুনুর রশিদের (৭৮৬-৮০৯ খ্রিষ্টাব্দ) শাসনকালে। সে সময় রাজকীয় গ্রন্থাগারে সাহিত্য, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অমূল্য গ্রন্থসমূহ একত্র করা হতে থাকে। একই সঙ্গে পারস্যের বিভিন্ন সাহিত্য, উপকথা ও জ্যোতির্বিদ্যাসংক্রান্ত কাজ আরবিতে অনূদিত হতে শুরু করলে রাজকীয় এ প্রতিষ্ঠানটি একটি সমৃদ্ধ গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার রূপ পেতে থাকে।

তবে বাইতুল হিকমাহর ইতিহাসে সবচেয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয় খলিফা আলমামুনের (৮১৩-৮ ৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) পৃষ্ঠপোষকতায়। তার প্রত্যক্ষ উদ্যোগে অনুবাদচর্চা, দর্শন, গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণা বিশেষ গতি পায়। গ্রিক ভাষার বহু বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক রচনা আরবিতে অনুবাদ করা হয়, যা মুসলিম পণ্ডিত ও গবেষকদের জন্য মূল গ্রন্থগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন, পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করে দেয়।

এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হলো ‘অনুবাদ আন্দোলন’। অনুবাদ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রিক দর্শন, চিকিৎসা, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার পাশাপাশি ভারতীয় গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্ব আলেমদের গবেষণায় যুক্ত হয়। ফলে প্রাচীন সভ্যতার অর্জিত জ্ঞান হারানো থেকে বেঁচে যায় এবং নতুন নতুন গবেষণার ক্ষেত্র খুলে যায়। পণ্ডিতেরা কেবল অনুবাদেই ক্ষান্ত ছিলেন না; তাঁরা প্রাচীন তত্ত্বগুলোর ব্যাখ্যা, গঠনমূলক সমালোচনা ও সম্প্রসারণ করেন। পরবর্তীতে আরবিতে সংরক্ষিত ও বিকশিত এই বিশাল জ্ঞানভান্ডার ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়ে ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

বায়তুল হিকমাহ কেন্দ্রিক এই জ্ঞান বিপ্লবে বিশ্বসেরা বহু মনীষী সরাসরি অবদান রাখেন। তাঁদের মধ্যে বীজগণিতের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইবনে মুসা আলখাওয়ারিজমি অন্যতম, যাঁর লাতিন নাম থেকে ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটির উৎপত্তি হয়। পাশাপাশি গণিত ও যন্ত্রপ্রকৌশলে অবদান রাখেন বনু মুসা তিন ভাই—মুহাম্মদ, আহমদ ও হাসান। চিকিৎসক হুনায়ন ইবনে ইসহাক গ্রিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রধানতম কাজগুলো আরবিতে রূপান্তর করেন। অনুবাদ, দর্শন ও বিজ্ঞানের শাখাগুলোতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন সাবিত ইবনে কুররা এবং আলকিন্দির মতো খ্যাতিমান দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা।

বাগদাদের গণ্ডি পেরিয়ে জ্ঞান অনুরাগের এই ধারা ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তেও। আন্দালুসের কর্ডোবা, টলেডো ও মিসরের কায়রোর মতো শহরগুলো পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় ১০০৫ খ্রিষ্টাব্দে কায়রোতে ফাতিমি খলিফা আলহাকিম প্রতিষ্ঠা করেন ‘দারুল হিকমাহ’। আরবি থেকে লাতিনসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হওয়ায় প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় জ্ঞান বিশ্বজুড়ে গবেষক ও পাঠকদের হাতের নাগালে পৌঁছায়।

খলিফা আলমামুনের পর আব্বাসি প্রশাসনের কেন্দ্র সামারায় স্থানান্তরিত হলে বাইতুল হিকমাহর প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনায় পরিবর্তন আসে। তবে পরবর্তী সময়ে এর প্রভাব কতটা কীভাবে বদলেছিল সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সীমিত হলেও মুসলিম বিশ্বে অনুবাদ ও গবেষণা থামেনি। শতক ধরে চলে আসা এই জ্ঞানচর্চায় চরম আঘাত আসে ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে, যখন মোঙ্গল শাসক হালাকু খানের বাহিনী বাগদাদ আক্রমণ করে। নগরজুড়ে চলা তাণ্ডবে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান এবং অপূরণীয় ক্ষতি হয় বহু গ্রন্থাগার ও দুর্লভ পাণ্ডুলিপির। যদিও প্রতিষ্ঠানটির সুনির্দিষ্ট শেষ পরিণতি নিয়ে ঐতিহাসিক তথ্য শতভাগ নিশ্চিত নয়, তবুও হালাকু খানের হামলাকে বাইতুল হিকমাহর ধ্বংসের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।

আজ বাইতুল হিকমাহর শারীরিক অস্তিত্ব না থাকলেও বৈশ্বিক গবেষণার ইতিহাসে এর অবদান অমর হয়ে রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে জ্ঞানের অগ্রগতি কোনো একক জাতির অবদান নয়, বরং বিভিন্ন সভ্যতার পারস্পরিক চিন্তা ও অভিজ্ঞতার বিনিময়ের ফসল। মানবজাতির এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্য স্মরণের পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিয্যতের জন্য উন্মুক্ত চিন্তাচর্চা, শিক্ষা ও মুক্ত গবেষণার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করে।

বায়তুল হিকমাহর ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় খলিফা আলমামুনের শাসনামল (৮১৩-৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দ)। তার পৃষ্ঠপোষকতায় অনুবাদ, দর্শন, গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা বিশেষ গতি লাভ করে। গ্রিকসহ বিভিন্ন ভাষার বিজ্ঞান ও দর্শনের গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হয়। বিদ্বানেরা এসব গ্রন্থ অধ্যয়ন, বিশ্লেষণ ও গবেষণার সুযোগ পান।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh