অস্ট্রেলিয়ায় ফেসবুক মার্কেটপ্লেসের দেয়ালঘড়ি এবং এক বিষণ্ণ তরুণীর স্মৃতি

Published: October 31, 2026, 9:44 am

অস্ট্রেলিয়ায় নতুন যাওয়ার পর সেখানকার পথঘাট কিংবা ট্রেন রুট সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না। মুঠোফোনে যোগাযোগের সুবিধার্থে একের পর এক অ্যাপ নামাতে নামাতে স্টোরেজ প্রায় পূর্ণ হয়ে উঠছিল। তবুও অ্যাপ ও ম্যাপের নির্দেশনা ছাড়া সেখানে চলাচল করা অসম্ভব। দোকানে নতুন জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি হওয়ায় প্রয়োজন আর সামর্থ্যের সমীকরণ মেলাতে নজর দিতে হতো ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে। কারো কাছে যা অপ্রয়োজনীয়, অন্য কারো কাছে তা মহামূল্যবান—এই নীতিতেই সেখানে কেনাবেচা বা হাতবদল চলে। কিন্তু নিজস্ব গাড়ি না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে নিখরচায় জিনিস আনাও কঠিন ছিল। কারণ ট্রেন বা বাসে পথ পাড়ি দিয়ে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে গুগলের সাহায্য ছাড়া উপায় ছিল না।

এমনি এক অনুসন্ধানে একটি দেয়ালঘড়ির খোঁজ মেলে। গুগল ম্যাপে ঠিকানা যাচাই করে দেখা যায়, বর্তমান অবস্থান থেকে গন্তব্যে পৌঁছাতে কেবল ট্রেনে কাটবে আড়াই ঘণ্টার বেশি সময়, আর তারপর রয়েছে আরও দুই কিলোমিটার হাঁটার পথ। ঘড়িটার প্রতি আকর্ষণ থাকায় পণ্যদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সেই তরুণী প্রস্তাব দেন, নিকটস্থ ট্রেন স্টেশন পর্যন্ত গেলে তিনি নিজেই গাড়ি নিয়ে আসবেন। ট্রেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও চারপাশের দৃশ্য উপভোগের সুযোগ থাকায় প্রস্তাবে রাজি হয়ে নির্দিষ্ট দিনে দুপুরের পরপরই রওনা দেওয়া হয়।

ট্রেন যখন প্রত্যন্ত সেই স্টেশনে পৌঁছায়, তখন বিকালের আলোয় চারপাশ অপূর্ব রূপ ধারণ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার সেই গ্রামীণ পরিবেশে দালানকোঠা বা দোকানপাট তেমন ছিল না; ছিল কেবল বিস্তীর্ণ ফসলি জমি আর নির্জন প্রান্তর। স্থায়ী বসবাসের সুবিধা (পিআর) কিংবা চাকরির প্রয়োজনে কিছু মানুষ গ্রামে থাকলেও সেখানকার নির্জনতা শহরের চেয়ে অনেক বেশি। স্টেশনের ওয়েটিং রুমে পৌঁছাতেই দেখা যায় এক তরুণী মুখ নিচু করে বসে আছেন। সাধারণত এই সময়ের তরুণ-তরুণীরা অপেক্ষার মুহূর্তে ফোনে ব্যস্ত থাকেন, কিন্তু তাকে নীরব দেখে একটু অবাক হতে হয়। পরিচয় বিনিময়কালে দেখা যায়, চায়নিজ বংশোদ্ভূত সেই তরুণীর চোখ দুটি লাল ও ভীষণ বিষণ্ণ। তবে ইংরেজিতে বেশ দক্ষ ছিলেন তিনি।

কথোপকথনের একপর্যায়ে নিচু কণ্ঠে তরুণী জানান, আগে পৃথিবীকে তার খুব আপন মনে হলেও এখন আর তা মনে হয় না। তাই জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলে নিজের প্রিয় জিনিসগুলো মানুষকে দিয়ে দিচ্ছেন। করোনা মহামারি চলাকালীন তিনি তার অধিকাংশ ব্যবহার্য জিনিস অন্যদের বিলিয়ে দিয়েছিলেন, কারণ মানুষের তৃপ্ত মুখ তাকে আনন্দ দেয়। অবশিষ্ট অল্প কিছু জিনিসও তিনি একে একে দিয়ে দেবেন এবং নিজের কাছে কিছুই রাখবেন না। ঘড়ির পাশাপাশি আরও কিছু জিনিস তিনি সঙ্গে এনে তুলে দেন।

কথায় কথায় শহরের দিকে ফেরার শেষ ট্রেনের সময় ঘনিয়ে আসে। ট্রেন মিস করলে আর ফেরার উপায় ছিল না। তাড়াহুড়ো করে ট্রেনে ওঠার মুহূর্তে তরুণীটি লেখকের হাত চেপে ধরেন—যে হাত বরফের মতো শীতল ছিল। চোখে অশ্রু নিয়ে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, তিনি দীর্ঘ দিন ধরে একা থাকেন, তার আপন কেউ নেই এবং নতুন বন্ধুও হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো তিনি আর বেশি দিন বাঁচবেন না। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পর জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল সেই নির্জন স্টেশনে দাঁড়িয়ে মেয়েটি কাঁদছে, আর চারপাশ ঘিরে ধরছে সন্ধ্যার ঘন অন্ধকার ও শীতল হাওয়া।

বাড়ি ফেরার কয়েক দিন পর মেসেঞ্জারে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে দেখা যায় সেই তরুণীর অ্যাকাউন্টটি বন্ধ হয়ে গেছে। প্রোফাইল বা তার অন্য কোনো অস্তিত্বও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোনো ফোন নম্বর জানা না থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, যা বুকের মধ্যে এক গভীর শূন্যতা ও বিষাদ তৈরি করে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh