কমিউনিটি পুলিশিং: জনআস্থা ফেরাতে কার্যকর উদ্যোগ কেন জরুরি

Published: October 31, 2026, 7:45 am

‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’—এই প্রচলিত ধারণার মূল অর্থ হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে পুলিশের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও আস্থা অপরিহার্য। কমিউনিটি পুলিশিং কোনো বিকল্প বা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নয়, বরং এটি পেশাদার পুলিশিংকে আরও জনবান্ধব, তথ্যসমৃদ্ধ এবং জবাবদিহিমূলক করার একটি কার্যকর পদ্ধতি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অপরাধ প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৪২ ও ৪৪ ধারায় নাগরিকদের তথ্য প্রদান ও সহায়তার বিধান থাকলেও, এর মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবক বা কোনো কমিটিকে আইন প্রয়োগকারী বা শাস্তিমূলক ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।

বর্তমানে বাংলাদেশে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার পথে রাজনৈতিক প্রভাব, পুলিশ ও জনগণের আস্থার সংকট এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আধিপত্যের কারণে নারী, তরুণ, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব থাকে না। এছাড়া প্রশিক্ষণের অভাব, জবাবদিহির ঘাটতি, সরকারি সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা এবং অপরাধসংক্রান্ত তথ্যদাতাদের নিরাপত্তার অভাব এ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনগণের নেতিবাচক ধারণা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

জনআস্থা পুনর্গঠনে শুধুমাত্র সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ না থেকে পুলিশের আচরণ, স্বচ্ছতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির বাস্তব অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন আনা জরুরি। থানা ও বিট পর্যায়ে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করতে হবে। চুরি, মাদক, হয়রানি, সড়কনিরাপত্তা এবং অনলাইন প্রতারণার মতো পুনরাবৃত্ত সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ‘কমিউনিটি সেফটি প্ল্যান’ গ্রহণ করা যেতে পারে। এই পরিকল্পনায় স্বচ্ছ যোগাযোগ, মাসিক সভার নথি, গোপনীয় তথ্য প্রদানের ব্যবস্থা এবং প্রতি তিন মাসে কার্যক্রমের ফলাফল পর্যালোচনার বিধান থাকা প্রয়োজন।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ে স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা ও ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট রাখা আবশ্যক। তারা কোনো অবস্থাতেই কাউকে আটক, তল্লাশি বা শাস্তি দিতে পারেন না। পুলিশের লোগো ব্যবহার করে পরিচয়পত্র তৈরি বা পুলিশের আইনগত ক্ষমতা অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো ব্যক্তির পরিচয় বা রাজনৈতিক মতের ভিত্তিতে তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। গুরুতর অপরাধের তদন্ত অবশ্যই আইনানুগ আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় হতে হবে, যেখানে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের অংশগ্রহণকারীরা তদন্তের বিকল্প হতে পারেন না।

পরিশেষে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও জনগণকে অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। পুলিশকে ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক মতের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে। যখন পুলিশ নিরপেক্ষভাবে মানুষের কথা শুনবে, অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং ভুল হলে তা সংশোধন করবে, তখনই জনআস্থা ফিরে আসবে। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সাফল্য নির্ভর করে জনগণের সম্মতি, পারস্পরিক আস্থা, অংশীদারত্ব ও জবাবদিহির ওপর। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কমিটি গঠনসহ সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই ব্যবস্থাকে সফল করতে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo