দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামী ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। সরকারের এ ঘোষণায় দ্বীপজুড়ে আনন্দের আবহ তৈরি হলেও স্থানীয় বাসিন্দা, হোটেল-রিসোর্ট মালিক, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, নৌযানচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে চিন্তার উদ্রেক হয়েছে। পর্যটন কার্যক্রম শুরু মানেই দ্বীপবাসীর ভাগ্যের দুয়ার খুলে যাওয়া নয়; বরং পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সেন্টমার্টিনের প্রবাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও ভঙ্গুর প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষায় পর্যটন নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। অপরিকল্পিত পর্যটন, প্লাস্টিক বর্জ্য, পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পরিবেশদূষণ দ্বীপটির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যটকের সংখ্যা নির্ধারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণ ফি চালুর উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও পরিবেশ রক্ষার নামে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা বিপন্ন করা গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বীপের প্রায় ১২ হাজার বাসিন্দার অধিকাংশ পর্যটনশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বছরের কয়েক মাসের আয়ের ওপর নির্ভর করে অনেক পরিবারকে বাকি সময় চলতে হয়, কিন্তু পর্যটন সীমিত থাকায় তাদের জীবনে ঋণের বোঝা ও বেকারত্ব বেড়েছে।
প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল অর্জনের পথে কঠোর বিধিনিষেধ, যাতায়াত ব্যয় ও সীমিত অবকাঠামো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথ পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নিরাপত্তাজনিত কারণে এ রুট বন্ধ থাকলেও বিকল্প হিসেবে কক্সবাজার থেকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল নৌপথ সাধারণ পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করছে। এছাড়া দ্বীপের বিদ্যুৎ সংকট অত্যন্ত উদ্বেগজনক; দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া ও প্রতি ইউনিটের উচ্চমূল্য স্থানীয়দের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। পর্যটনশিল্পের বিকাশে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানীয় জল, চিকিৎসা ও শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে স্থানীয় জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপের জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পর্যটনকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের মতামত ছাড়া কোনো পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। পরিবেশ সংরক্ষণের কারণে যেসব মানুষ জীবিকা হারাচ্ছেন, তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পর্যটন মৌসুমের বাইরের সময়েও যাতে পরিবারগুলো জীবনযাপন করতে পারে, সে জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ প্রয়োজন। সেন্টমার্টিন কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি হাজারো মানুষের বসতভিটা ও অস্তিত্বের ঠিকানা। তাই প্রকৃতির পাশাপাশি দ্বীপের মানুষকে বাঁচানোই হোক মূল লক্ষ্য।





