বাংলাদেশে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’, ‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’ এবং ‘ধর্ম যার যার নিরাপত্তা সবার’—এই তিনটি বচনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেকেই এসব স্লোগানের সমর্থনে পবিত্র কোরআনের সুরা আল-কাফিরুনের শেষ আয়াত ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন’ (তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম এবং আমার জন্য আমার ধর্ম) সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। সুরাটিতে মহান আল্লাহ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অমুসলিমদের উদ্দেশে একটি স্পষ্ট নীতি ঘোষণা করতে বলেছিলেন। এই ধর্মীয় নির্দেশের সঠিক প্রয়োগ ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার আলোকেই দেশে দুর্গাপূজার লগ্ন অতিবাহিত হয়ে থাকে।
২০২৬ সালের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজা ব্যাপক সরকারি নিরাপত্তা, বর্ধিত আনন্দ-উৎসব ও সুষ্ঠু পরিবেশের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে এ বছরই প্রথম পূজায় বর্ধিত সরকারি ছুটি, বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ এবং দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য বিশেষ বাস ও ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজিরবিহীন পাহারা লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকার পূজা মণ্ডপগুলোতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-র সক্রিয় উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যা ভারতের উগ্রপন্থি বা আশ্রিত পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কোনো ধরনের অঘটন ঘটানোর পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেয়। দুর্গাপূজা বা যেকোনো সাধারণ সময়ে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে অপপ্রচার চালানো হয়, পর্যবেক্ষকদের মতে তার উল্টো চিত্রই বাস্তবে দেখা যায়। বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের অমুসলিমরা বারবার ভারতের কূটনৈতিক চক্রান্তের শিকার হন, অন্যদিকে ১৯৭২ সাল থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ও বাম রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো সাম্প্রদায়িকতাকে রাজনীতি চর্চার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
এবারের দুর্গাপূজায় গণমাধ্যমের কভারেজ ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রী-উপদেষ্টারা বিভিন্ন মণ্ডপ পরিদর্শন করে পূজার সার্বিক নিরাপত্তার খবর নেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যিনি তাঁর বক্তৃতায় ক্রমাগত ‘মানবিক মর্যাদা’ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়ে থাকেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট করে বলেন—‘ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা সবার’। অন্যদিকে, গত ১৭ অক্টোবর রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির পরিদর্শনকালে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। আপনাদের এই অধিকার রাষ্ট্র থেকে পাওয়া, সংবিধান থেকে পাওয়া। এই সংবিধান আমাদের যে অধিকার দিয়েছে, সেটি রক্ষা করতে হবে।’ প্রচলিত ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ স্লোগানের সঙ্গে ‘রাষ্ট্র সবার’ অংশটি যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তাঁর ফ্যাসিস্ট শাসনামলে দুর্গাপূজায় নানা বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। এমনকি পূজার সুযোগে তাঁর বাসভবনে ফুটবল খেলার আয়োজনও করা হয়েছিল। শেখ হাসিনা এবং প্রয়াত আওয়ামী নেত্রী মতিয়া চৌধুরীসহ তৎকালীন বাম নেতারা প্রায়ই ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ স্লোগানটি উচ্চারণ করে কোরআনের আয়াতটি উদ্ধৃত করতেন। তবে ওই আয়াতের প্রকৃত অর্থ ও প্রয়োগ নিয়ে তৎকালীন সময়ে খুব কম আলেমই কথা বলার সাহস পেয়েছিলেন, আবার কতিপয় আলেম এর ভিন্ন ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একপর্যায়ে এমনও মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘মা দুর্গার জন্য এবার দেশে ভালো ফসল হয়েছে’—যা ইসলামি ভাবধারায় সরাসরি শিরক বা আল্লাহর একক ক্ষমতার সঙ্গে অন্য কাউকে অংশীদার করার মতো মারাত্মক গুনাহ হিসেবে বিবেচিত। কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মানুষ, ফসল ও সমগ্র সৃষ্টির একক স্রষ্টা আল্লাহ। মোগল সম্রাট আকবরও অমুসলিম স্ত্রীদের মন্ত্রণা ও সুযোগসন্ধানী আলেমদের প্ররোচনায় ‘দ্বীন-ই-ইলাহি’ নামের নতুন ধর্ম প্রবর্তন করে গরু জবাই ও খতনা নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে মুসলমানদের ক্ষুব্ধ করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে বিশ্ববরেণ্য ইসলামি চিন্তাবিদ মুজাদ্দেদ আল ফেসানী এই শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে দাঁড়ান। তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, অমুসলিমদের ওপর জোরজুলুম বা জোরপূর্বক ধর্মান্তর যেমন ইসলামে নিষিদ্ধ, তেমনি কোনো সম্প্রদায়কে তুষ্ট করতে রাষ্ট্র শরিয়তের বিধান অকার্যকর করতে পারে না।
সুরা কাফিরুনের তাফসির অনুযায়ী, রাসুল (সা.)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল অমুসলিমদের স্পষ্ট জানিয়ে দিতে যে, তাদের উপাস্য এবং মুসলমানদের উপাস্য এক নয়। সুরা ইউনুসের ১০৪ নম্বর আয়াতেও আল্লাহ নবীকে অমুসলিমদের উদ্দেশ্যে বলতে বলেছেন যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য যাদের বন্দিগী করা হয়, মহানবী (সা.) তাদের বন্দিগী করেন না। আলেম সমাজের মতে, কিছু বিভ্রান্ত ব্যক্তি এই সুরার মাধ্যমে কাফেরদের কুফরির ওপর টিকে থাকার স্বীকৃতি হিসেবে দেখার ভুল করেন। ইসলাম অবশ্যই উদার, কিন্তু উদারতার অর্থ সত্য দাওয়াত থেকে বিরত থাকা বা অন্যের ধর্মীয় উপাসনাকে নিজের উৎসব মনে করা নয়। সুরা আজ-জুমারেও দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত রাখার নির্দেশ এসেছে।
বর্তমান সরকারের পলিসি নীতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা সবার’ বক্তব্যটিকে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সঠিক বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি মানবিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে এই অমুসলিমদের সুরক্ষার কথা বলছেন, যা কোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বা ভারতীয় সহানুভূতি পাওয়ার উদ্দেশ্যে নয়। ইসলামে সব মানুষ ‘আদম সন্তান’ হিসেবে মর্যাদাবান। রাসুলুল্লাহ (সা.) অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা অমুসলিমদের প্রতি অন্যায় বা জুলুম করবে, তাদের নির্ধারিত অধিকার খর্ব করবে, সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ করাবে বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পত্তি দখল করবে, কেয়ামতের দিন রাসুল (সা.) নিজে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মহানবী (সা.) ‘মদিনা সনদ’ প্রণয়ন করে সব ধর্ম ও গোত্রের মানুষের জন্য সমান সমঅধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। যদিও শেখ হাসিনার আমলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তৎকালীন মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজাল মদিনা সনদকে ধর্মনিরপেক্ষতার উৎস হিসেবে দেখানোর অপচেষ্টা করেছিলেন।
এবারের পূজা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে সতর্কতার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘হিন্দু ধর্মমতে’ দেবী দুর্গার আগমন ঘটে অন্যায় বিনাশ ও সৃষ্টির কল্যাণে। এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, নেজামে ইসলাম পার্টি ও খেলাফত মজলিসের নেতারা জানিয়েছেন, স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালনের সুযোগ একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্রকাঠামোতেই সবচেয়ে বেশি সুনিশ্চিত। হিন্দুরা তাদের ধর্মকর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে এবং সরকার তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেবে, এটিই নিয়ম। কিন্তু কোনো মুসলমান অন্য ধর্মের ধর্মীয় আচার বা পূজা-পার্বণকে নিজের উৎসব হিসেবে দাবি করতে বা অংশ নিতে পারে না। উৎসবের এই সার্বজনীনতার ব্যাখ্যােই মূল পার্থক্য।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার ও বামপন্থিরা সবসময় দুর্গাপূজাকে সার্বজনীন উৎসব দাবি করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর রাজনৈতিক মালিকানা ফলাতে চেয়েছিল, যদিও বাস্তবে আওয়ামী লীগের আমলেই হিন্দুদের ওপর হামলা ও সম্পত্তি দখলের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। এমনকি ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে শাপলা চত্বরের গণহত্যাকে পরবর্তীতে ‘কিসাস’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার বিভ্রান্তিকর চেষ্টা চালিয়েছিল তৎকালীন সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ স্লোগানের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা সবার’ স্লোগানটিই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। কারণ ১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান বিভাগ এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় এ দেশের মাটির সঙ্গেই যুক্ত থেকে জীবন দিয়েছেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ফলে তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই মৌলিক ও শরিয়তসম্মত দায়িত্ব।





