মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যবসায়ীর মেয়ের ওপর থেকে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের (ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে স্পেশালি ডেজিগনেটেড ন্যাশনালস অ্যান্ড ব্লকড পারসনস লিস্ট (এসডিএন তালিকা) থেকে মিয়ানমারের নাগরিক থেইন্ট উইন থেটের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। মার্কিন সরকারের এই তালিকা থেকে নাম সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে আদালতে মামলা করেছিলেন ওই নারী। গত সপ্তাহে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করার তথ্য প্রকাশ পায়। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর জেনারেলদের একঘরে করে রাখার যে নীতি মার্কিন প্রশাসন নিয়েছিল, এটি ছিল তা থেকে স্পষ্ট সরে আসার ইঙ্গিত। সেই খবরের পরপরই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার এই আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত এলো।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র থেইন্ট উইন থেটের ওপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের বিষয়ে বলেন, সিদ্ধান্তটি মূলত মার্কিন প্রশাসনের এই মূল্যায়নেরই প্রতিফলন যে, বার্মা-সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত লক্ষ্য অর্জনে তাঁকে তালিকাভুক্ত রাখা আর কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখছিল না। মুখপাত্র মিয়ানমারের সাবেক নাম ‘বার্মা’ ব্যবহার করে আরও জানান, বর্তমানে প্রশাসন দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার এগিয়ে নিতে বিভিন্ন পথ অবলম্বন করছে। এর মধ্যে রয়েছে সাইবার প্রতারণাকেন্দ্র বা স্ক্যাম সেন্টার দমন, মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক পরিবেশের উন্নয়ন এবং অব্যাহত সহিংসতা ও মানবিক সংকট দূর করতে শান্তিপ্রক্রিয়াকে উৎসাহ দেওয়া।
২০২১ সালে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর দফায় দফায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন। জান্তাকে সহায়তা করার অভিযোগে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও তাদের অংশীদারদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। সেই অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৩৫ লাখেরও বেশি নাগরিক। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় শ্বে বায়াইন ফিউ গ্রুপ অব কোম্পানিজ, এর প্রতিষ্ঠাতা থেইন উইন জাও ও তাঁর পরিবারকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ ছিল, এই বাণিজ্যিক গোষ্ঠী সামরিক বাহিনীর জন্য জ্বালানি তেল আমদানি ও বিতরণের কাজ করত এবং এই পরিবার জান্তা সরকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠানের মালিক।
বাবার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে এসডিএন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেন থেইন উইন জাওয়ের মেয়ে থেইন্ট উইন থেট। তবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত প্রথম দফায় তাঁর মামলাটি খারিজ করে দিয়েছিল। সাধারণত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নাম উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সব ধরনের সম্পদ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং মার্কিন নাগরিকদের সঙ্গে তাঁদের লেনদেন নিষিদ্ধ হয়। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়েও সামরিক বাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে তালিকাভুক্ত একাধিক মিয়ানমারের নাগরিক ও একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছিল ওয়াশিংটন।
পরবর্তীতে চলতি বছরের জুলাইয়ে থেইন্ট উইন থেট নতুন করে মার্কিন আদালতে আবারও অভিযোগ দায়ের করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, তাঁর বাবার ব্যবসার সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত নন। নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করার পর কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার সুযোগ বিঘ্নিত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর শিক্ষাজীবন থমকে যায়। আদালতে জমা দেওয়া আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে তাঁর মার্কিন ক্রেডিট কার্ডগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, বিদেশি ব্যাংক হিসাব সীমিত বা বন্ধ করা হয়েছে এবং নতুন কোনো ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগও দেওয়া হয়নি। তিনি জানান, শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করতে না পেরে বর্তমানে তিনি থাইল্যান্ডের ব্যাংককে তাঁর মায়ের সঙ্গে বসবাস করছেন। উল্লেখ্য, গত বছর তাঁর মায়ের ওপর থেকেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল।
মার্কিন প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে মানবাধিকার বিষয়ক পর্যবেক্ষণ সংস্থা জাস্টিস ফর মিয়ানমার। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা যখন বেসামরিক নাগরিকদের ওপর একের পর এক নৃশংস হামলা বাড়াচ্ছে, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের পদক্ষেপ নিল। জান্তার সশস্ত্র সন্ত্রাসে অর্থ জোগানো সুবিধাভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের এভাবে নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে বাদ দেওয়াকে অত্যন্ত নিন্দনীয় বলে আখ্যায়িত করেছে সংস্থাটি। অন্যদিকে, মামলাটি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর থেইন্ট উইন থেটের আইনজীবী ও ওয়াশিংটনভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা-বিশেষজ্ঞ এরিক ফেরারি ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার মার্কিন জেলা আদালতে একটি নোটিশ জমা দিয়ে স্বেচ্ছায় মামলা প্রত্যাহারের কথা জানিয়েছেন। তবে আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এই আইনজীবী।





