পটুয়াখালীতে ডিসির সভায় ‘এমপির প্রতিনিধি’ হয়ে বক্তব্য দিলেন অস্ত্র মামলার আসামি

Published: October 9, 2026, 5:06 am

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে নবাগত জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মতবিনিময় সভায় অস্ত্র আইনের মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি ও বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজীর উপস্থিতি এবং বক্তব্য দেওয়া নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি এই সরকারি সভায় অংশ নেন। সম্প্রতি তাঁর বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

উপজেলা প্রশাসনের অফিসার্স ক্লাবে আয়োজিত ওই মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক চৌধুরী আশরাফুল করীম। মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ মো. রাসেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় পটুয়াখালী-১ (সদর, মির্জাগঞ্জ ও দুমকী) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ আলতাফ হোসেন চৌধুরীর প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজী। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ইলিয়াস মিয়ার সঞ্চালনায় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মির্জাগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খান নুরুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি গোলাম ফারুক মুন্সি ও আমিনুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ মুন্সি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মনির, সাবেক সভাপতি আলহাজ আশ্রাফ আলী হাওলাদার, সদস্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক দুলাল হোসেন। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, ছাত্র প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর ভোরে মির্জাগঞ্জ সেনা ক্যাম্পের একটি বিশেষ অভিযানে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজী। সে সময় তাঁর কাছ থেকে একটি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও দুটি গুলি উদ্ধার করা হয়। এরপর তাঁকে মির্জাগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হলে ৭ নভেম্বর তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) এনামুল হক বাদী হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করেন। একই বছরের ৬ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও থানার পরিদর্শক খান নুরুল ইসলাম আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বর্তমানে মামলাটি পটুয়াখালী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে এবং এর সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহদপ্তর সম্পাদক মনির হোসেনের স্বাক্ষরিত এক আদেশে জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজীকে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের নভেম্বরে দলের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত আরেকটি আদেশে তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে প্রাথমিক সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

এই বিতর্কিত ব্যক্তির এমপির প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন নিয়ে স্থানীয় বিএনপিতে ক্ষোভ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে দলবিরোধী অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তি যখন স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন, তা দল ও সমাজের জন্য অপ্রত্যাশিত। কিন্তু এমপির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় তারা নীরব থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমানও এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশের অভিযোগপত্রভুক্ত আসামির সরকারি সভায় অংশ নেওয়া এবং বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। এ বিষয়ে কথা বলতে জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

অন্যদিকে, মির্জাগঞ্জ ইউএনও শেখ মো. রাসেল জানান, সংসদ সদস্যের পরামর্শেই জাহাঙ্গীর হোসেনকে ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, 'সংসদ সদস্যের পরামর্শে তাঁকে আমাদের অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ করা হয়েছে। মামলাটি আগের হওয়ায় বিষয়টি আমার নজরে ছিল না।' তিনি আরও জানান, জাহাঙ্গীর হোসেন স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নেন। এ বিষয়ে পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী বলেন, 'একজন ভালো মানুষকে আজকাল কীভাবে চোর বানিয়ে ফেলে! তাঁর কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না, কীভাবে পেল, কোথায় পেল, তা আমি জানি না। তবে আমি যতটুকু জানি, তিনি রাজনৈতিকভাবে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন।'

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo