বিশ্ববাণিজ্যের দুই দুঃস্বপ্ন: হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের সংকট

Published: September 18, 2026, 3:06 am

বিশ্ববাণিজ্যের ইতিহাসে কিছু জলপথ আছে, যেগুলোর আয়তন ছোট হলেও গুরুত্ব মহাদেশের চেয়েও বড়। হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মান্দেব তেমনই দুটি সামুদ্রিক ‘চোকপয়েন্ট’। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যা পারস্য উপসাগরের তেল-গ্যাসের প্রধান দরজা। অন্যদিকে, বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে নিয়ে জিবুতি ও ইয়েমেনকে যুক্ত করেছে। ফারসি শব্দ ‘বাব আল-মান্দেব’-এর অর্থ মৃত্যু দরজা। অতীতে নাবিকরা দিকনির্দেশনা ভুল করে এই পথে দিশাহারা হয়ে পড়তেন বলেই এমন নামকরণ করা হয়েছিল। ভৌগোলিকভাবে এটি সরু হলেও বিশ্ব জ্বালানি অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব অসীম। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দুই জলপথের সংকট বিশ্ববাণিজ্য, জ্বালানি, খাদ্য, শিল্প ও কোটি কোটি মানুষের জীবনে অভিঘাত সৃষ্টি করছে।

২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই আশঙ্কাকে আর শুধু কল্পনায় থাকতে দিচ্ছে না। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (EIA) হিসাবে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত তরল পরিবাহিত হয়েছে, যা বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম তরল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। একই সময়ে প্রতিদিন ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এ পথ দিয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের ২০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ হরমুজ কেবল একটি জলপথ নয়, এটি বিশ্ব জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনি। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব মাত্রার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে এবং ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। তেলের দাম বাড়লে ট্রাকের ভাড়া, জাহাজের ভাড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়, কারখানার উৎপাদন খরচ, কৃষির সেচ ও পরিবহন ব্যয়—সবই বেড়ে যায়।

অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব বিশ্ববাণিজ্যের আরেক দরজা স্বরূপ। হরমুজের সংকট মূলত জ্বালানি সরবরাহের সংকট হলেও, বাব আল-মান্দেবের সংকটের চরিত্র কিছুটা ভিন্ন। এটি বিশ্ববাণিজ্যের সময় ও দূরত্বের সংকট। ইয়েমেন ও আফ্রিকার জিবুতি-ইরিত্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর উত্তরে রয়েছে সুয়েজ খাল, যা এশিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়া জাহাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথিদের তৎপরতায় বাব আল-মান্দেবও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনায় বড় বড় জাহাজ কোম্পানি আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ বেছে নিচ্ছে।

২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বাব আল-মান্দেব দিয়ে তেল পরিবহন ৮ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন পর্যন্ত উঠেছিল বলে ইআইএর তথ্য দেখায়। একই সময়ে সুয়েজ খাল ও সুমেড (SUMED) পাইপলাইন দিয়ে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত তরল পরিবহনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন। এই সংখ্যাগুলো দেখায়, এই জলপথগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যদি দুটিই একই সময়ে কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সংকট আর মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। হরমুজ বন্ধ হলে উপসাগরীয় তেল ও এলএনজির প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। বাব আল-মান্দেব বন্ধ হলে এশিয়া-ইউরোপের সমুদ্রপথে সুয়েজের কার্যকারিতা আরো কমে যাবে। অর্থাৎ একটি পথ বন্ধ করবে জ্বালানির সরবরাহ, আর অন্যটি বাড়াবে বাণিজ্যের দূরত্ব ও পরিবহন ব্যয়। বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি বাণিজ্য সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়, তাই একসঙ্গে ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতি দুই দিক থেকে চাপে পড়বে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই সংকটের অভিঘাত আরো তীব্র হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটা নতুন বিপদের ঘণ্টা। হরমুজে তেল ও এলএনজি সরবরাহ কমলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়বে। বাব আল-মান্দেব ও সুয়েজের সংকটে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় বাড়বে। এই দুই ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বাড়বে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি। একজন বাংলাদেশি নাগরিক হরমুজ বা বাব আল-মান্দেবের মানচিত্র হয়তো কখনো দেখেননি, কিন্তু ওই দুই জলপথের সংকট তার বাজারের ব্যাগে, বাসের ভাড়ায় কিংবা বিদ্যুতের বিলে এসে পৌঁছাতে পারে। কৃষির জন্য ডিজেল, সেচে বিদ্যুৎ, সার আমদানি ও পণ্য পরিবহনের জন্য জ্বালানি অপরিহার্য।

আধুনিক বিশ্ববাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরে ‘জাস্ট ইন টাইম’ মডেলের ওপর দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা বাড়লে এই মডেল ভেঙে পড়ে। একটি কনটেইনার যদি নির্ধারিত সময়ের বদলে দুই-তিন সপ্তাহ দেরিতে আসে, তাহলে পুরো উৎপাদন পরিকল্পনা বদলে যেতে পারে। সৌদি আরব কিছু তেল হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প রুটে পাঠাতে পারে এবং মিসরের সুমেড পাইপলাইনও গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। কিন্তু EIA-ও উল্লেখ করেছে যে, বিকল্প রুটগুলো দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও সীমিত সক্ষমতার। অর্থাৎ সংকটের সময় বিশ্ব বুঝতে পারে দক্ষতার জন্য তৈরি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা সবসময় স্থিতিস্থাপকতার জন্য তৈরি নয়। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব যদি একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়, তখন বিশ্ববাজারে শুধু জাহাজের পথ বন্ধ হবে না, একইসঙ্গে বিশ্বায়নের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসই সংকুচিত হয়ে আসবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh