কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের কারণে বিশ্বজুড়ে চাকরি হারানোর যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তাকে ভিন্নভাবে দেখছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও গবেষক সানি মো. আশরাফ খান। তাঁর মতে, এআই বাংলাদেশের কর্মশক্তিকে প্রতিস্থাপন বা বাতিল করবে না, বরং সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে কাজ করা এই বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এআই-সক্ষম জনশক্তি, এজেন্টিক এআই, ভার্চ্যুয়াল রেমিট্যান্স এবং ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নিজের বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
২০০৮ সালে ইনফ্রাটেক কনসালট্যান্টস লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করা আশরাফ খান বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, অটোমেশন অবশ্যই কিছু প্রচলিত কাজের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে। তবে প্রযুক্তির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রযুক্তি কেবল কাজ বিলুপ্ত করে না, বরং কাজের ধরন বদলে দেয়। তাই মূল চ্যালেঞ্জটি এআইয়ের আগমন নয়, বরং আমাদের জনশক্তিকে এআই-সক্ষম করে গড়ে তোলা। একজন এআই-সক্ষম কর্মী আগে যেখানে ৫ থেকে ১০ জন মিলে কাজ করতেন, সেখানে একাই সেই কাজের বড় অংশ সম্পন্ন করতে পারবেন। লক্ষ্য হতে হবে মেশিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা নয়, বরং মেশিনকে নিজের কাজে লাগানোর সক্ষমতা অর্জন করা।
‘এআই-সক্ষম জনশক্তি’ ধারণার ব্যাখ্যা দিয়ে এই উদ্যোক্তা জানান, একসময় কম্পিউটার জানা যেমন আলাদা দক্ষতা ছিল, বর্তমানে তা সব পেশার অংশ হয়ে গেছে। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই রূপান্তর ঘটবে। একজন দর্জি এআই দিয়ে পোশাকের নকশা ও বাজার বিশ্লেষণ করতে পারেন, আবার একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসাব-নিকাশ, উৎপাদন পরিকল্পনা ও বিদেশি ক্রেতা খোঁজার কাজে এটি ব্যবহার করতে পারেন। এমনকি কোডিং না জেনেও একজন তরুণ এআইয়ের সাহায্যে অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করতে সক্ষম। আশরাফ খানের মতে, এআই যুগে বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি খাত হওয়া উচিত এআই-সক্ষম মানবসম্পদ।
নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আশরাফ খান জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সাড়ে ৩২ হাজারের বেশি মানুষকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী এবং ৪ হাজারের বেশি মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপার রয়েছেন। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত কর্মসূচির আওতায় ১ হাজারের বেশি স্টার্টআপকে সহায়তা এবং ৩ হাজারের বেশি উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাদের ৩৬ শতাংশই নারী। তিনি মনে করেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন কোনো সামাজিক ব্যয় নয়, এটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিনিয়োগ।
জেনারেটিভ এআইয়ের পরবর্তী ধাপ হিসেবে ‘এজেন্টিক এআই’ (Agentic AI)-এর কথা উল্লেখ করেন এই গবেষক। তিনি জানান, বর্তমান এআই নির্দেশনার ভিত্তিতে উত্তর বা ছবি তৈরি করে, কিন্তু এজেন্টিক এআই ব্যবহারকারীর অনুমতি ও নির্ধারিত সীমার মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ সম্পন্ন করবে। যেমন, থাইল্যান্ড ভ্রমণের কথা বললে ভবিষ্যতের এআই এজেন্ট নিজেই ব্যবহারকারীর পছন্দ ও ক্যালেন্ডার দেখে ফ্লাইট ও হোটেল বুকিংয়ের কাজ এগিয়ে নেবে। আগে যেখানে মানুষকে একাধিক অ্যাপ খুলে বিভিন্ন ধাপে কাজ করতে হতো, ভবিষ্যতে এআই এজেন্ট নিজেই সফটওয়্যার পরিচালনা করবে। এর ফলে মানুষের উৎপাদনশীলতার সংজ্ঞা পুরোপুরি বদলে যাবে।
এআইয়ের কারণে মানবজাতির ধ্বংস বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা সম্পর্কে আশরাফ খান বলেন, এআইয়ের ঝুঁকিগুলো এখনই দৃশ্যমান, যেমন—প্রতারণা, ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি, সাইবার অপরাধ এবং ভুল তথ্যের বিস্তার। তবে এই ভয়ে প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা হবে বড় ভুল। বিষয়টিকে গাড়ির সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, গাড়ি দুর্ঘটনার ভয়ে আমরা গাড়ি নিষিদ্ধ করিনি, বরং ব্রেক, ট্রাফিক আইন ও সিটবেল্ট তৈরি করেছি। এআইয়ের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এজেন্টিক এআইয়ের যুগে প্রযুক্তিকে কতটুকু স্বাধীনতা দেওয়া হবে এবং কোথায় মানুষের অনুমতির প্রয়োজন হবে, তা নির্ধারণ করা জরুরি।
ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আশরাফ খান বলেন, প্রচলিত পরীক্ষা ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বের হয়ে এসে সমস্যা সমাধান ও বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনে জোর দিতে হবে। এআইয়ের যুগে তথ্যের অভাব নেই, তাই তথ্য মনে রাখার চেয়ে তা কাজে লাগানোর সক্ষমতাই আসল। বাংলাদেশেই এই নতুন শিক্ষা মডেল তৈরি সম্ভব, কারণ দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী ও সীমিত সম্পদের কারণে কম খরচে সাশ্রয়ী ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। এই মডেল একসময় বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব বলে তিনি বিশ্বাস করেন। এমনকি স্কুল থেকে ঝরে পড়া বা কম দক্ষ তরুণদের জন্যও এআই বড় সুযোগ তৈরি করবে, কারণ এটি দক্ষতা অর্জনের প্রবেশদ্বারকে সহজ করে দেয়।
কারখানায় অটোমেশনের ফলে কর্মসংস্থান হ্রাসের বিষয়ে তিনি বলেন, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ কমলেও মেশিন পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রোগ্রামিং ও নতুন পণ্য ডিজাইনে দক্ষ মানুষের চাহিদা বাড়বে। এ ছাড়া তিনি তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণার ভিত্তিতে ‘ভার্চ্যুয়াল রেমিট্যান্স’ ধারণার ওপর জোর দেন। ১ হাজার ৬০০ জন ডিজিটাল দক্ষ তরুণকে নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ তরুণ ঘরে বসে কাজ করছেন, ৯০ শতাংশের বেশি তরুণ শহরে স্থানান্তর এড়াতে পেরেছেন এবং ৩৫ শতাংশ সরাসরি বিদেশি ক্লায়েন্টের কাজ করছেন। রাজশাহীতে বসে ইউরোপের ডিজাইন বা বরিশালে বসে উত্তর আমেরিকার ডিজিটাল মার্কেটিং করার মাধ্যমে দেশে বসেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব, যাকে তিনি ভার্চ্যুয়াল রেমিট্যান্স বলছেন।
প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজনকে ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার স্বপ্নের কথা জানিয়ে আশরাফ খান বলেন, এর জন্য ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, সহজ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা, স্থানীয় ডিজিটাল হাব ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন প্রয়োজন। এই রূপান্তর সফল করতে সরকার, শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়কে একযোগে কাজ করতে হবে। সরকারকে এআই-সক্ষম জনশক্তি ও ডিজিটাল রেমিট্যান্সকে জাতীয় অর্থনৈতিক সক্ষমতা হিসেবে দেখতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাস্তবমুখী স্নাতক তৈরি করতে হবে। সানি মো. আশরাফ খানের স্বপ্ন, বাংলাদেশ যেন কেবল ভবিষ্যৎ আমদানি না করে, বরং একটি এআই-সক্ষম প্রজন্ম গড়ে তুলে নিজেই ভবিষ্যৎ তৈরি করে।





