ঢাকার ইসিবি চত্বরের নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতের সশস্ত্র হামলার পরিকল্পনা হয়েছিল একটি খাবারের দোকানে বসে। জমি ও চলাচলের রাস্তা নিয়ে বিরোধের জেরে এই হামলার জন্য দুটি সন্ত্রাসী বাহিনী থেকে ভাড়াটে লোক জোগাড় করা হয়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, হামলার দিন দুপুরে ইসিবি চত্বরের একটি খাবারের দোকানে বৈঠক হয়। সিসিটিভি ফুটেজে সেখানে ১৩ জনকে দেখা গেছে, যাদের মধ্যে গ্রেপ্তার শাহরিয়ার মাহমুদ ও ঠিকাদার বিকাশ চন্দ্র শাহকে শনাক্ত করা হয়েছে। এই বৈঠকেই হামলার সিদ্ধান্ত হয় এবং লোক জোগাড়ের দায়িত্ব পান বিকাশ। তিনি ঠিকাদারি কাজের পাশাপাশি রাস্তা আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। বিকাশ এরপর মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ আলম অনিকের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন ভাষানটেক থানা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ইব্রাহিম (পুলিশের তালিকায় ‘কিলার ইব্রাহিম’) এবং পল্লবীর মফিজুর রহমান মামুনের সঙ্গে। মামুনকে গত মঙ্গলবার খুন, চাঁদাবাজি ও জমি দখলের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
হামলার দিন বিকেল চারটার দিকে ভাষানটেকের দেওয়ানপাড়া দোতলা মসজিদের সামনের মাঠে এবং মানিকদী এলাকায় প্রায় ২০০ হামলাকারী জড়ো হয়। ইব্রাহিমের অনুসারী মাসুম ওরফে ফরসা মাসুম ভাষানটেক বস্তি ও পল্লবী থেকে লোক এনে জড়ো করেন। সেখান থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে পাঁচটি পিকআপে ও হেঁটে তারা নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে যায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মূল ফটকে গুলি ছুড়ে হামলা শুরু হয়। হামলাকারীরা প্রায় ৫০টি গুলি ছোড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ৫টি গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থলে যাওয়া ৬ পুলিশ সদস্যকে লক্ষ্য করেও গুলি চালানো হয়। হামলায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। সম্প্রতি বিএফআইইউ সালমানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে।
মামলাটি ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে ডিবি গুলশান বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে। ডিবির উপকমিশনার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন জানান, এ ঘটনায় এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী (গত বুধবার গ্রেপ্তার), মিজানুর রহমান, শাহরিয়ার মাহমুদ, শাহ আলম, মামুন (বাহিনীপ্রধান মামুন নন), আসলাম ও মুন্না। তাঁরা সবাই রিমান্ডে আছেন।
তদন্তে জানা গেছে, ২০১১ সাল থেকে ক্যান্টনমেন্টের ইসিবি চত্বর এলাকায় জমি কিনে আবাসন ব্যবসা শুরু করেন নিউগিনির মালিক নাজিম উদ্দিন ভুঁইয়া। বর্তমানে তাঁর প্রকল্পের আয়তন ১০-১২ বিঘা। এর সংলগ্ন ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। নাজিমের দাবি, এই ৩৫ কাঠার মধ্যে ১৫ কাঠা জমি গোলাম মহিউদ্দিন তাঁর কাছে বিক্রি করেছিলেন, যেখানে তিনি সীমানাপ্রাচীর দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হামলা চালিয়ে সেই প্রাচীর ভেঙে দেওয়া হয়। গোলাম মহিউদ্দিন জমি বুঝিয়ে না দিয়ে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের ঘোষণা দেন এবং নিউগিনির ভেতর দিয়ে রাস্তা দাবি করেন। এই ভবন নির্মাণের কাজ পেয়েছিলেন বিকাশ চন্দ্র শাহ, যিনি রাস্তা আদায়ের জন্য সন্ত্রাসী ভাড়া করেন।
অন্যদিকে, নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধেও জমি জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। জোয়ার সাহারা এলাকায় সাড়ে আট কাঠা জমির পুরো দাম না দিয়ে বিক্রির অভিযোগে গত জুলাইয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন মিজানুর রহমান। এজাহার অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকায় জমিটি কেনার বায়নাপত্র হয়। নাজিম ১ কোটি টাকা দিলেও বাকি ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা ৫ মাসে পরিশোধ না করে জমিটি অন্যের কাছে বিক্রি করে দেন। নাজিম উদ্দিনের দাবি, প্রতিপক্ষরা তাঁকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে হয়রানি করছে। ২০২২ সালে বিএনপি-জামায়াত ট্যাগ দিয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় তিনি কারাগারে ছিলেন। আবার ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে মামলা দেওয়া হচ্ছে।





