রাজধানী ঢাকার ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কমাতে ১৯৯৫ সালে হাতে নেওয়া হয়েছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আবাসন উদ্যোগ ‘পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প’। তবে দীর্ঘ ৩১ বছর পেরিয়ে গেলেও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এই মেগা প্রজেক্ট আজও পুরোপুরি বসবাসের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধার তীব্র সংকটের কারণে স্থবির হয়ে আছে পুরো প্রকল্প। সেই সঙ্গে জনশূন্যতার সুযোগে সেখানে অপরাধের ঝুঁকিও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৬,২২৭ একর জমির ওপর বিস্তৃত এই বিশাল আবাসন প্রকল্প। কাগজে-কলমে রাজউক প্রকল্পের সিংহভাগ কাজ শেষ করার দাবি করলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্লট গ্রহীতা ও আবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘসূত্রতার মূল কারণ হলো বহুমুখী প্রশাসনিক জটিলতা, অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত এবং মৌলিক নাগরিক সেবার অভাব। গত তিন দশকে বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করায় কাজের কোনো ধারাবাহিকতা বা নীতিগত স্থায়িত্ব ছিল না। এছাড়া দফায় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর ফলে প্রাথমিক খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যার আর্থিক চাপ শেষ পর্যন্ত প্লট গ্রহীতাদের ওপরই পড়েছে।
প্রকল্পের ১৭ নম্বর সেক্টরের স্থানীয় অধিবাসী নাঈম আহমেদ নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, একটি এলাকায় বসবাসের জন্য নিরাপত্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও শপিং কমপ্লেক্সের মতো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকা জরুরি। কিন্তু পূর্বাচলে এখনো এসবের কিছুই গড়ে ওঠেনি। নিরাপত্তার অভাব থাকায় অনেক প্লট মালিক সেখানে ভবন নির্মাণ করতে ভয় পাচ্ছেন। একইভাবে ২৮ নম্বর সেক্টরে গড়ে ওঠা একমাত্র ভবনের বাসিন্দা সজিব মৃধা জানান, হাজার হাজার প্লট বরাদ্দ এবং কিছু ভবন তৈরি হলেও এখনো বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে মানুষ সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সাহস পাচ্ছে না। স্কুল, হাসপাতাল ও বাজারের অনুপস্থিতিতে সেখানে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুরু থেকেই ভূমি অধিগ্রহণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে বিরোধ এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় জমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতায় আটকে ছিল। জমির সীমানা নির্ধারণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং মূল লে-আউট নকশার বৈধতা নিয়ে বহুবার আইনি লড়াই মাঠপর্যায়ের উন্নয়ন কাজকে ব্যাহত করেছে। এছাড়া প্রকল্পের মহাপরিকল্পনা বা লে-আউট দফায় দফায় পরিবর্তন করা হয়েছে। কখনো স্টেডিয়ামের স্থান বদল, আবার কখনো বাণিজ্যিক জোনের নকশা পরিবর্তন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্মিত রাস্তা বা ড্রেন ভেঙে নতুন করে সড়ক প্রশস্তকরণ বা আন্ডারগ্রাউন্ড ইউটিলিটি লাইনের কাজ করতে হয়েছে, যা সরকারি অর্থের বড় অপচয় ঘটিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অধিকাংশ সেক্টরে স্থায়ী বসতি না থাকায় এবং ফাঁকা প্লট পড়ে থাকায় সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা সুনসান হয়ে পড়ে। ফলে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার কারণে প্লট মালিকরা সেখানে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে বাড়ি বানাতে সাহস পাচ্ছেন না।
অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে ৩০০ ফুট প্রশস্ত এক্সপ্রেসওয়ে যাতায়াত ব্যবস্থাকে অনেকটাই সহজ করেছে। প্রশাসনিক কার্যক্রম জোরদার করতে এলাকাটিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি এটি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও ঢাকা ওয়াসার অধীনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের রূপগঞ্জ ও কালীগঞ্জ অংশকে ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে。
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে গত ১ জুলাই পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে নবনির্মিত ‘বরকাউ পুলিশ ক্যাম্প’ উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইজিপি জানান, পূর্বাচল এলাকায় ডিএমপির চারটি থানা, ছয়টি তদন্ত কেন্দ্র এবং দুটি পুলিশ লাইনস স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এছাড়া তিনটি ডিসি অফিস স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং বিভিন্ন সেক্টরে ৪১টি পুলিশ বক্স স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।
নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি জানান, নগরবাসীর জীবনমান স্বস্তিদায়ক করতে ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো জরুরি নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। খুব শিগগির স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে পূর্বাচল সরেজমিনে পরিদর্শন করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত ও দ্রুত সমাধান করা হবে। এছাড়া নাগরিকদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে ডিএনসিসির জোনাল অফিস স্থাপনের কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি মোবাইলে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮: ২৮আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮: ২৯
পূর্বাচলের লে-আউট বা মহাপরিকল্পনা দফায় দফায় পরিবর্তন করা হয়েছে, যা অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের পরিচায়ক। কখনো স্টেডিয়ামের স্থান পরিবর্তন, আবার কখনো বাণিজ্যিক জোনের লে-আউট বদলানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্মিত রাস্তা বা ড্রেন ভেঙে আবার নতুন করে বড় পরিসরে (যেমন ৪ লেন থেকে সড়ক প্রশস্তকরণ বা আন্ডারগ্রাউন্ড ইউটিলিটি লাইনের জন্য রা





