স্বৈরাচার হটাতে পারলেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়তে আমরা ব্যর্থ: মাহফুজ আনাম

Published: October 4, 2026, 11:18 am

স্বৈরাচারী শাসন উৎখাত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের ঈর্ষণীয় ও অনন্য সক্ষমতা থাকলেও, পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তাঁর মতে, স্বৈরাচার বিদায়ের পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারার এই ব্যর্থতার মূল কারণ হলো প্রতিটি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) উদ্যোগে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিন রোববার দুপুরে এ মন্তব্য করেন তিনি। ‘আমরা কি জানি কীভাবে শাসন পরিচালনা করতে হয়?’ শীর্ষক একটি অধিবেশনে বক্তব্য রাখছিলেন মাহফুজ আনাম।

বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্তমান সময়ের মতো এত যুদ্ধ আর কখনো দেখা যায়নি। যেকোনো শক্তিশালী দেশ চাইলেই অন্য দেশে বোমা ফেলছে, যার ফলে ছোট দেশগুলো চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, এল নিনোর প্রভাব ও সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় যেখানে বিপুল সম্পদ প্রয়োজন, সেখানে বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের পেছনে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। সার্বভৌমত্বের ধারণাকে অস্ত্রের মজুত ও সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলাকে তিনি আত্মঘাতী হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মাহফুজ আনাম বলেন, একটি নৃশংস সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হলেও এখানে কার্যকর কোনো গণতন্ত্র গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ১৯৯১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পতনের পর দেশে গণতন্ত্রে ফেরার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তখন আশা করা হয়েছিল গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ঘটবে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে কয়েকটি নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পরিবর্তে দেশ ক্রমশ সংঘাত ও ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গেছে। দেশ পরিচালনার সঠিক উপায় ও শাসনব্যবস্থার প্রকৃত অর্থ না জানার কারণেই এই ব্যর্থতা তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। মানুষের শক্তি, মেধা ও সহনশীলতাকে কীভাবে জাতীয় উন্নয়নে কাজে লাগাতে হয়, তা আমরা শিখতে পারিনি।

স্বৈরাচার উৎখাতের সময় পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হলেও পরবর্তীতে সেই ঐক্য ধরে রাখা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বৈরাচার পতনের পর ঐক্যবদ্ধ দলগুলোই নিজেদের মধ্যে শত্রুতায় জড়িয়ে পড়ে। ফলে গণতান্ত্রিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার মুখ থুবড়ে পড়ে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত রাজনীতিকরণকে প্রধান সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, চিকিৎসকদের থেকে শুরু করে সাংবাদিক পর্যন্ত সব পেশাজীবী আজ রাজনৈতিক আদর্শে বিভক্ত। বিএনপিপন্থী, আওয়ামী লীগপন্থী বা জামায়াতপন্থী সাংবাদিকতার সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যার প্রধান সম্পদ বিশ্বাসযোগ্যতা, সে কীভাবে প্রকাশ্যে কোনো দলের পক্ষ নিয়ে নিজের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারে?

আমলাতন্ত্র, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক ব্যবহারের সমালোচনা করে মাহফুজ আনাম বলেন, গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত কোনো সরকার ক্ষমতায় আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই জনগণের ইচ্ছাকে জনস্বার্থের বদলে দলীয় স্বার্থে রূপান্তর করে ফেলে। পুরো শাসনব্যবস্থাকে নিজের দলের অঙ্গসংগঠন বা সম্প্রসারণে পরিণত করার মাধ্যমেই পতনের সূত্রপাত ঘটে। এর ফলস্বরূপ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় পক্ষপাতিত্বের কারণে বছরের পর বছর ধরে পুরো শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

তবে প্রযুক্তি ও শিক্ষার মাধ্যমে একটি দক্ষ আমলাতন্ত্র এবং ন্যায়সংগত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আমাদের কার্যকর আমলাতন্ত্র ও পুলিশ বাহিনী দিতে পারে। কম জমিতে বিপুল জনসংখ্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের এই বিপুল মানবসম্পদকে সুশাসন, শিক্ষা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে মূল্যবান ও উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo