ইয়েমেনের হোদেইদাহ ও মোখা শহরের মধ্যবর্তী লোহিত সাগর উপকূলীয় আল-খোখা শহর থেকে হুতি বিদ্রোহীদের তীব্র আক্রমণের মুখে ঘর ছাড়তে বাধ্য হন সাঈদ হাসান ও মোহাম্মদ নামের দুই ভাই। সরকারি বাহিনীর পিছু হটার খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এক অলৌকিক ও লোমহর্ষক যাত্রার পর অবশেষে ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সাত দিনে তাঁরা নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছান।
৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সাঈদ হাসানের ছেলেরা জানান, বিপুলসংখ্যক সরকারি সেনা সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। সাঈদ নিজে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে হতবাক হন। ইরান-সমর্থিত হুতিরা তখন হোদেইদাহ ও তাইজ প্রদেশে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। প্রথমে ব্যাপক গোলাবর্ষণ ও পরে স্থলপথে অগ্রসর হয়ে হুতিরা মোখা ও আল-খোখাসহ উপকূলীয় এলাকা দখল করে নেয়। এই পরিস্থিতিতে সাঈদ তাঁর ভাই মোহাম্মদ ও তাঁর পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত আল-খোখা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের ভয় ছিল, হুতিদের বাহিনী পেছন থেকে এগিয়ে এসে তাঁদের ধরে ফেলতে পারে। এদিকে তাইজে তুমুল লড়াইয়ে ২৪ ঘণ্টায় ১,৫৪০ (1540) হুতি সেনা হতাহত হয়েছে বলে দাবি করে ইয়েমেন সেনাবাহিনী। রাত প্রায় ১২টার দিকে সাঈদ মোখায় পৌঁছে দেখেন, পুরো শহর প্রায় জনশূন্য। এর আগে ২০১৮ সালে হোদেইদা বন্দরের কাছের গ্রাম থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে তাঁরা আল-খোখায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।
তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ছাড়ার সময় তাঁরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, কিছু পোশাক ও হালকা জিনিসপত্র ছাড়া আর কিছুই নিতে পারেননি। মোহাম্মদ ও তাঁর স্ত্রী কাপড়ের ব্যবসা করলেও বিপুল পরিমাণ কাপড় সঙ্গে নেওয়া সম্ভব হয়নি। সাঈদ তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই পুত্রবধূ, মেয়ে ও নাতনিকে নিয়ে একটি ছোট পিকআপে এবং মোহাম্মদ তাঁর স্ত্রী ও এক আত্মীয়কে নিয়ে আরেকটি গাড়িতে রওনা হন। পথে পালিয়ে আসা তিন সেনাকেও গাড়িতে তুলে নেন মোহাম্মদ। রওনা দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা জানতে পারেন, স্থানীয় লোকজন তাঁদের ফেলে আসা ঘরগুলো খুলে নিয়ে গেছে এবং জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেছে।
যাত্রাপথটি ছিল চরম বিপদসংকুল ও পানির তীব্র সংকটে ভরা। পথে বেশির ভাগ মুদিদোকান বন্ধ ছিল এবং খোলা থাকা দোকানেও খাওয়ার পানি ছিল না। এর মধ্যে মোহাম্মদের গাড়ির টায়ার ফেটে প্রায় উল্টে যাওয়ার উপক্রম হয়। চারপাশে বিস্ফোরণের তীব্র শব্দের মধ্যে একটি পুরোনো নষ্ট টায়ার লাগিয়ে তাঁরা কোনোমতে সামনে এগিয়ে যান। রাস্তায় হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় নিহত সেনাদের মরদেহ এবং পরিত্যক্ত অস্ত্র পড়ে থাকতে দেখেন তাঁরা। হুতিদের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে অনেক সরকারি সেনাকে সামরিক পোশাক খুলে ফেলতে এবং অস্ত্র বালুর নিচে পুঁতে রাখতে দেখা যায়।
মোহাম্মদ জানান, রাস্তার পাশে পড়ে থাকা বিচ্ছিন্ন মরদেহ দেখে তাঁর স্ত্রী ভয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন। অনেকে পায়ে হেঁটে পালালেও পিছু হটা সেনারা খালি গাড়ি নিয়ে তাঁদের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। পরদিন সকালে থুবাব এলাকা পেরিয়ে যাওয়ার সময় মোহাম্মদের গাড়ির বিকল্প টায়ারটিও নষ্ট হয়ে যায়। তৃষ্ণার্ত ও ক্লান্ত মোহাম্মদ টায়ার কাঁধে নিয়ে মেরামতের দোকানের খোঁজে মাইলের পর মাইল হাঁটেন। তাঁর স্ত্রী তৃষ্ণায় কাতর হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে পানি চাইলেও কেউ সাহায্য করেনি। অবশেষে এক ব্যক্তি গাড়ি থামিয়ে তাঁর দুই হাতের তালুতে সামান্য পানি ঢেলে দিয়ে চলে যান।
এদিকে ১০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সাঈদ সপরিবার এডেনে পৌঁছে একটি অস্থায়ী স্কুলক্যাম্পে আশ্রয় নেন। সেখানে একটি কক্ষে আটটি পরিবারকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছিল। মোহাম্মদ পরদিন এডেনে পৌঁছান। পথে এক সেনা তাঁদের পানি দেন। এডেনে অনেক সেনাকে তাঁদের রাইফেল মাত্র ৫০০ সৌদি রিয়ালে বিক্রি করতে বা ফেলে দিতে দেখা যায়। আল-খোখা থেকে এডেন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ একবারও জ্বালানি না নিয়ে প্রায় শূন্য ট্যাংকি নিয়ে পাড়ি দেওয়াকে অলৌকিক অভিজ্ঞতা বলে বর্ণনা করেন দুই ভাই।
১২ সেপ্টেম্বর তাঁরা এডেন পেরিয়ে আবইয়ান প্রদেশের লাওদারে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং জ্বালানি সংকটে সেখানে দুই দিন অপেক্ষা করেন। ১৪ সেপ্টেম্বর আবার রওনা হয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর শাবওয়া প্রদেশের হুরা এলাকায় সাঈদের গাড়ি নষ্ট হলে স্থানীয় এক মেকানিককে দিয়ে তা মেরামত করান। অবশেষে ১৬ সেপ্টেম্বর তাঁরা মুকাল্লার পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছান।
বর্তমানে মুকাল্লায় তিন কক্ষের একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছেন দুই পরিবার। যার মাসিক ভাড়া ৪০০ সৌদি রিয়াল। এছাড়া জামানত হিসেবে দিতে হয়েছে আরও ৪০০ (400) রিয়াল এবং দালালকে ২০০ (200) রিয়াল। তবে দুই সপ্তাহেও কোনো কাজ পাননি দুই ভাই। মোহাম্মদ জানান, টাকা বাঁচাতে তাঁরা সকালের খাবার খাওয়া বাদ দিয়েছেন। তিনি দিনমজুর হিসেবে যেকোনো কাজ করতে প্রস্তুত। এদিকে মোহাম্মদের স্ত্রী ফাতিমার সবচেয়ে বড় চিন্তা কাপড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া ১ কোটি ২০ লাখ ইয়েমেনি রিয়ালের ঋণ শোধ করা।
ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯০৬ জন বা ২৯ হাজার ৫১৯টি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যার বড় অংশই তাইজ প্রদেশের। মুকাল্লায় সরকারি বাস্তুচ্যুত ব্যবস্থাপনা ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ আওয়াদ জানান, অনেকেই শুধু পরনের কাপড় নিয়ে সেখানে পৌঁছেছেন। তাঁদের মৌলিক চাহিদা পূরণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলে একটি শিবির স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।





