একটি শিশুর পৃথিবী অত্যন্ত সীমাবদ্ধ—একটি ঘর, উঠান, খেলার মাঠ, স্কুল এবং তার প্রিয়জনদের ঘিরে গড়ে ওঠা এই জগতটিই তার নিরাপত্তার প্রধান আশ্রয়। শিশু স্বভাবতই পৃথিবীকে বিশ্বাস করে, যা তার শৈশবের মূল ভিত্তি। কিন্তু যখন কোনো শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়, তখন তার শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি বিশ্বাসের জগতটিও ধূলিসাৎ হয়ে যায়। পরিচিত মানুষ, ঘর কিংবা বড়দের প্রতি যে আস্থা সে লালন করে, তা ভয় ও আতঙ্কে রূপ নেয়। একটি পরিচিত হাত বা পরিচিত মুখ যখন ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন শিশুর কাছে পৃথিবী আর আগের মতো থাকে না।
ধর্ষণকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না; এর শিকড় অনেক গভীরে। আমাদের সমাজে পুরুষত্ব, ক্ষমতা এবং সম্পর্কের যে সংজ্ঞা প্রচলিত, তা এই সহিংসতার পথ প্রশস্ত করে। ছেলেদের শেখানো হয় কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভাষা, আর মেয়েদের শেখানো হয় বিপদ এড়ানোর দায়িত্ব। এই অসাম্যই যৌন সহিংসতাকে কেবল আকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়, বরং ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার করে তোলে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতার অসমতা আরও প্রকট, কারণ তারা বড়দের প্রশ্ন করতে শেখে না, বরং তাদের মান্য করার শিক্ষা পায়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৩০৬ জন মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ জনের বয়স ছয় বছরের নিচে, ৯৪ জনের বয়স সাত থেকে বারো বছর এবং ১০৩ জন ছিল কিশোরী। এছাড়া একই সময়ে ১২৯টি ধর্ষণের প্রচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে এক একটি শিশুর কান্না ও হারিয়ে যাওয়া শৈশব। অনেক ক্ষেত্রে লজ্জা, ভয় বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, যা নীরবতার এক সংস্কৃতি তৈরি করে।
শিশুদের শেখাতে হবে যে বড়রাও ভুল করতে পারে এবং কেউ তাদের অস্বস্তিকর স্পর্শ করলে ‘না’ বলার অধিকার তাদের আছে। অপরাধীর পরিচিত মুখ হওয়ার কারণে অনেক সময় সত্য আড়াল করা হয়, কিন্তু শিশুর শরীরের ওপর কোনো সামাজিক পরিচয়ের অধিকার নেই। অপরাধীর দায়ভার সমাজ যেন কোনোভাবেই ভুক্তভোগী শিশুর ওপর চাপিয়ে না দেয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। অপরাধীর কাজের বদলে শিশুর আচরণ তদন্তের বিষয় হয়ে ওঠা একটি বিপজ্জনক সামাজিক প্রবণতা।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল আইন বা বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; স্কুল, হাসপাতাল এবং প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিশুকে এমন পরিবেশ দিতে হবে যেখানে সে নির্ভয়ে কথা বলতে পারে। সমাজকে ছেলেদের নতুন ভাষা শেখাতে হবে—যেখানে শক্তি মানে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সম্মান। শিশুর নিরাপত্তার বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্য ফেলে না রেখে এখনই নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। প্রতিটি শিশুর শরীর ও অধিকার রক্ষায় সমাজ ও পরিবারকে সচেতন হতে হবে, যাতে একটি শিশু তার ছোট পৃথিবীকে আবার নিরাপদ মনে করতে পারে। কোনো পরিবারের সম্মান বা প্রতিষ্ঠানের সুনাম একটি শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বড় হতে পারে না।





