ফেসবুকে দত্তকের নামে শিশু কেনাবেচার রমরমা হাট, নেই আইনি নজরদারি

Published: October 3, 2026, 8:13 am

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘দত্তক’ দেওয়ার নামে প্রকাশ্যে চলছে শিশু কেনাবেচার দর-কষাকষি। বিভিন্ন গ্রুপ খুলে চক্রগুলো নবজাতক থেকে শুরু করে কয়েক মাস বয়সী শিশুদের লাখ লাখ টাকায় বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছে। আইন ও সরকারি নজরদারির বাইরে চলা এই অবৈধ হাটে ছেলেশিশুর চাহিদা ও দাম মেয়েশিশুর চেয়ে বেশি।

প্রথম আলোর ফ্যাক্টচেকার মো. সোহাগ মিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে গত ১২ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফেসবুকের ৩৯টি পাবলিক গ্রুপ যাচাই করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। এসব গ্রুপের সদস্যসংখ্যা কয়েক শ থেকে শুরু করে প্রায় ২০ হাজার পর্যন্ত। অনুসন্ধানের জন্য কয়েকটি গ্রুপে যুক্ত হয়ে এবং পরিচয় গোপন রেখে ক্রেতা সেজে দালাল ও বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। একটি ডজন গ্রুপের ২৮৮টি পোস্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এর মধ্যে ৩৪টি পোস্টে শিশু চেয়ে এবং ৬৩টি পোস্টে শিশু দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ফেসবুকের এসব গ্রুপে দরদাম ও চাহিদার ধরন আঁতকে ওঠার মতো। কেউ ‘জরুরি ছেলে শিশু’ চাইছেন, কেউ আবার নির্দিষ্ট বাজেটে বা নির্দিষ্ট মাসে শিশু খুঁজছেন। এমনকি গর্ভে থাকা অবস্থাতেই চুক্তি করার প্রস্তাবও দেখা গেছে। এক নারী সিজারিয়ানের খরচ দিয়ে গর্ভবতীর সঙ্গে চুক্তি করে শিশুকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, অন্যজন অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার জন্য সুন্দর মেয়ে শিশু চেয়েছেন। আবার ‘কাদের কাদের’ নামের এক ব্যক্তি স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধের জন্য নিজের দেড়-দুই বছর বয়সী সন্তানকে সাড়ে ৩ লাখ টাকায় বিক্রির পোস্ট দিয়েছেন। ফেসবুকে ‘বাচ্চা দত্তক নেওয়া এবং দেওয়ার গ্রুপ’-এর সদস্যসংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। সেখানে একজন লিখেছেন, ৫০ হাজার বা ১ লাখ টাকা যাঁরা চাইছেন, তাঁরা আসলে বাচ্চা দেবেন না। এই যুক্তি খাড়া করে গত ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি সম্ভাব্য ক্রেতাদের উদ্দেশে লিখেছেন, ‘এটা ১০০% (100%) রিয়েল পোস্ট, সবকিছু বুঝেশুনে তারপর নক দিবেন।’

অনুসন্ধানে একটি চক্রের নারী দالاলের খোঁজ পাওয়া যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সন্তান রাখতে অনিচ্ছুক গর্ভবতীদের সন্ধান পান তারা। প্রসব পর্যন্ত ওই নারীর দেখভাল করে এই চক্র। এরপর ছেলে নবজাতক ৩ লাখ এবং মেয়ে নবজাতক ২ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়, যেখান থেকে দالاলেরা কমিশন পান। অন্যদিকে, কুষ্টিয়ার আবদুল আলিম নামের এক ভুক্তভোগী জানান, তিনি এমন গ্রুপে তিনবার প্রতারিত হয়েছেন। সর্বশেষ এক নারী হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলে শিশু দেখিয়ে অগ্রিম ১০ হাজার টাকা নিয়ে নম্বর ব্লক করে দেন।

শুধু ফেসবুক নয়, বাইরেও টাকার বিনিময়ে দত্তক দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ দেখা গেছে। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে অবস্থিত ‘আল-বোখারি কেয়ারগিভিং সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, তারা বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার আড়ালে ‘আইনি অভিভাবকত্ব’ দেওয়ার নামে শিশু কেনাবেচার মধ্যস্থতা করছে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল আহাদ জানান, তারা ৫০ হাজার টাকা ফি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ও কম্পিউটারের দোকান থেকে নোটারি বা অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে চুক্তি করিয়ে দেন। বাচ্চার খরচসহ এতে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হয়।

আইন বিশেষজ্ঞরা এই প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ বলে অভিহিত করেছেন। অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং আইন কমিশনের সাবেক মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ফউজুল আজিম বলেন, এ ধরনের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন বা দরদামকে শিশু পাচার বা শোষণের ঝুঁকি হিসেবে দেখা দরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত এ নিয়ে তদন্ত করা। দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারা এবং ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে অসৎ উদ্দেশ্যে দত্তক নেওয়াকে কঠোর শাস্তির আওতায় রাখা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা বলেন, বাংলাদেশে সবার জন্য প্রযোজ্য কোনো সাধারণ দত্তক আইন নেই। মুসলিম আইনে দত্তক নেওয়ার সুযোগ নেই, তবে ধর্মনির্বিশেষে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে শিশুর আইনি অভিভাবকত্ব নেওয়া যায়। এ ছাড়া ২০১৩ (2013) সালের শিশু আইন অনুযায়ী, শিশুকল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুর বিকল্প পরিচর্যার দায়িত্ব হস্তান্তরের সুযোগ আছে। কিন্তু এভাবে শিশু কেনাবেচার পর তারা কোথায় যাচ্ছে বা কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার কোনো নজরদারি নেই। ফলে এই চক্রগুলোকে থামাতে সরকারের কঠোর তদারকি ও একটি সর্বজনীন আইন প্রণয়ন জরুরি।

এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, ফেসবুকে দত্তকের নামে প্রতারণার কথা তারা জানেন, তবে শিশু বিক্রির সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ এখনো পাননি। তাদের সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং টিম এখনো এ বিষয়ে কাউকে আইনের আওতায় আনেনি।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo