নেপালে হিমালয়ের ধস ও বন্যায় প্রাণহানির নেপথ্যে যেসব কারণ

Published: September 17, 2026, 9:58 am

হিমালয়ের বুকে সংঘটিত ভয়াবহ ধস ও বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি এবং ধ্বংসযজ্ঞের পর এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা। কোনো একক প্রাকৃতিক দুর্যোগকে দায়ি না করে গবেষকরা একাধিক কারণের সম্মিলিত প্রভাবকে এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করছেন। নতুন বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, অতীতের শক্তিশালী ভূমিকম্প, হিমবাহের সংকোচন, বরফে জমাট মাটির গলন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি—সবই পর্বতের ঢালকে বিপজ্জনকভাবে দুর্বল করে তুলেছে।

গত আগস্টের শেষ দিকে নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে শিলা ও বরফের স্রোত আছড়ে পড়লে শহর, সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যায়। এই ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান শেষ করে পুনর্গঠনের প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্যেই বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা শনাক্ত করা সম্ভব কি না।

ঘটনাটির সূত্রপাত ২৬ আগস্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, লাংটাং লিরুং পর্বতের প্রায় ২ হাজার ফুট প্রশস্ত একটি বিশাল অংশের শিলা ও হিমবাহের বরফ বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় ৭ হাজার ফুট নিচে নদীতে আছড়ে পড়ে। হিমালয় অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলের শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সীমারেখা প্রতি দশকে ৩২০ ফুটের বেশি উচ্চতায় উঠে যাচ্ছে। প্রচণ্ড আঘাতে বরফ তাৎক্ষণিকভাবে গলে গিয়ে পলি ও অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে মিশে যায়। উপত্যকার তলদেশে থাকা বরফের সঙ্গে ওই স্রোতের সংঘর্ষের ফলে বন্যার ঢেউ ২০ মাইলেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে। নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্বত জলবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ওয়াল্টার ইমারজিল এই ঘটনাকে হিমালয়ের একটি ‘নজিরবিহীন দুর্যোগ’ বলে অভিহিত করেছেন।

বিজ্ঞানীদের মতে, ২০১৫ সালের ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের সঙ্গে এই বিপর্যয়ের সম্ভাব্য সম্পর্ক থাকতে পারে। ওই ভূমিকম্পে পর্বতের দক্ষিণ পাশে ধস নেমেছিল, যা পর্বতের ঢালকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দিয়েছে। এছাড়া হিমালয় অঞ্চলে পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন জমাট থাকা বরফ ও মাটির স্তর উষ্ণতার কারণে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ইমারজিলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই স্তর গলে গেলে শিলার শক্তি কমে যায় এবং ঢালের ভেতরে পানি প্রবেশের সুযোগ বাড়ে, যা পাহাড়ের স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে যে, গত কয়েক দশকে লাংটাং-লিরুং হিমবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে পাতলা ও সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে ২০১০ সালের পর এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়েছে। হিমবাহের সংকোচনের ফলে শিলার ফাটলে গলিত পানি প্রবেশ করে পর্বতের ঢালের স্থিতিশীলতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া দুর্যোগের আগে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ও তুষারপাতও প্রভাব ফেলেছে। গত জুলাই ও আগস্টে স্থানীয়ভাবে রেকর্ড সর্বোচ্চ তাপমাত্রা দেখা গেছে, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ুবিজ্ঞানী ফ্রিডেরিকে অটো সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের ঘটনা মোকাবিলায় অভিযোজনের সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সৃষ্ট দূষণ দ্রুত কমানো না হলে ভবিষ্যতে একই মাত্রার দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের এই গবেষণা এখনো পীর-রিভিউ সম্পন্ন না হলেও, এটি পার্বত্য অঞ্চলে জলবায়ু পর্যবেক্ষণ ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Dainik Amader Shomoy