জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মঞ্চে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা সভাকক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার এই ঘটনার পাশাপাশি জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাইরেও ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। নেতানিয়াহু যখন মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত প্রতিনিধিদের একটি অংশ তাঁকে লক্ষ্য করে দুয়ো দিতে শুরু করেন। তবে তাঁর নিজের প্রতিনিধিদল দাঁড়িয়ে তালি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে অধিবেশনের সভাপতিকে বারবার শান্ত থাকার আহ্বান জানাতে দেখা যায়।
এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু সভাকক্ষে উপস্থিত অন্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘নৈতিকভাবে কাপুরুষ যেসব ব্যক্তি এখনো এই কক্ষ থেকে বের হয়ে যাননি, তারাও দয়া করে বের হয়ে যান।’ এএফপির সংগৃহীত একটি আনুষ্ঠানিক স্মারক থেকে জানা গেছে, ফিলিস্তিনের পক্ষ থেকে অন্যান্য রাষ্ট্রকে নেতানিয়াহুর ভাষণ যৌথভাবে বর্জন ও ওয়াকআউট করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
নেতানিয়াহুর ভাষণ চলাকালে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের কাছে কয়েক শ বিক্ষোভকারী জড়ো হন এবং সড়ক অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এ সময় তাঁরা ‘ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ করুন, গাজাকে বাঁচতে দিন’ এবং ‘ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ করুন, ইরানকে বাঁচতে দিন’ বলে স্লোগান দেন। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে পুলিশ সেখান থেকে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে。
সংক্ষিপ্ত সফরে যুক্তরাষ্ট্রে আসা নেতানিয়াহুর সঙ্গে এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো বৈঠকের কর্মসূচি ছিল না, যা বেশ অস্বাভাবিক। তবে সশরীরে বৈঠক না হলেও নিজের ভাষণে ট্রাম্পের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশকে রক্ষা করে যাব। আমরা জয়ী হতে থাকব, কারণ আমাদের আর কোনো পথ নেই। বর্বরদের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে বড় কোনো অংশীদার আমরা পাইনি। আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। তাঁর সাহসী নেতৃত্বের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ।’
গাজায় প্রায় তিন বছর আগে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ছে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহু, তাঁর তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং হামাসের তৎকালীন সামরিক কমান্ডারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পর থেকে নেতানিয়াহুর অনেক দেশে যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি চলতি মাসের শুরুতে ইসরায়েলের একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা জারির ঘোষণা দেয়। এ বিষয়ে ওয়াশিংটন নীরব থাকলেও নেতানিয়াহু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এসব দেশের নেতারা ইহুদিবিদ্বেষী জনতার কাছে নতি স্বীকার করার পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁরা দুর্বলতা বেছে নিয়েছেন। তাঁরা তোষণের পথ বেছে নিয়েছেন।’
নেতানিয়াহু তাঁর ভাষণে বিশেষভাবে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কড়া সমালোচনা করেন। এই দুটি দেশই পশ্চিম তীর থেকে ইসরায়েলি রপ্তানি পণ্যের ওপর সীমিত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ জাতিসংঘে তাঁর ভাষণে বলেছিলেন যে পশ্চিম তীরে হামাস সক্রিয় নয়, কারণ ঐতিহাসিকভাবে হামাসের শক্ত ঘাঁটি হলো গাজা। মাখোঁর এই মন্তব্য ইসরায়েলকে ক্ষুব্ধ করেছিল। জবাবে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার সময় ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অতীত ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের কড়া সমালোচনা করেন নেতানিয়াহু।
ভাষণে ইরানেরও তীব্র সমালোচনা করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। ইরানে ‘খুনে স্বৈরশাসন’ চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি ইরানের খুনে স্বৈরশাসনকে বোমা তৈরি করা থেকে বিরত রাখার অঙ্গীকার করেছিলাম।’ তিনি দাবি করেন, ইরানের নেতৃত্বের পতন ‘দূরে নয়’। জাতিসংঘে ইরানের দূত তাঁর খালি ডেস্কে নিহত কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলেইমানির ছবি রাখার বিষয়টিরও উল্লেখ করেন তিনি। তবে এত হামলার পরও ইরান সরকার ক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রেখে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরোধ জারি রেখেছে।





