মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অংশ হলো রাস্তা বা পথ। বাড়ি থেকে বের হওয়া, যাতায়াত এবং বিভিন্ন পার্থিব প্রয়োজনে মানুষকে প্রতিনিয়ত রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। মানুষের এই চলাচলের পথকে নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও বাধাহীন রাখাই ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মানুষের একটি স্বাভাবিক ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য, যা একজন মানুষের সুস্থ রুচিবোধ ও সুন্দর মননের পরিচয় বহন করে। পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে মানুষের শরীর ও মন যেমন সুস্থ থাকে, তেমনি মহান আল্লাহও তার ওপর সন্তুষ্ট হন। এ কারণে ইসলাম পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং ঘরবাড়ি ও তার চারপাশ পরিষ্কার রাখার নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষ করে নিজের ঘরের ময়লা-আবর্জনা দিয়ে যেন কোনো প্রতিবেশী বা পথচারী কষ্ট না পান, সেদিকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
তবে আমাদের বাস্তব সমাজচিত্র অত্যন্ত দুঃখজনক। অধিকাংশ মানুষই রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে চরম উদাসীনতা দেখান। যত্রতত্র ময়লা ফেলতে অনেকেই দ্বিধাবোধ করেন না, যার ফলে রাস্তাগুলো ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়। অনেকে গাড়ি বা রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় কলা কিংবা আম খেয়ে খোসাটি সড়কেই ফেলে দেন। এছাড়া রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলা, টায়ার জ্বালানো, অহেতুক পথ বন্ধ করা, রাস্তা কেটে রাখা, দোকান বা হোটেলের ময়লা রাস্তায় ফেলা, গ্যারেজ ও রিজার্ভ ট্যাঙ্কি পরিষ্কারের নোংরা পানি রাস্তায় ঢেলে দেওয়া, ইট-বালু, সুরকি-পাথর ও রডের মতো নির্মাণসামগ্রী স্তূপ করে রাখা, ঘরের ধুলাবালি ও উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলা, সিগারেটের প্যাকেট ও পানের পিক ফেলা, এবং ছাদের পানি নিষ্কাশনের পাইপ সরাসরি রাস্তায় দেওয়ার মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। ডাস্টবিনে ময়লা না ফেলে বহুতল ভবনের ওপর থেকে সরাসরি রাস্তায় ময়লা ফেলার প্রবণতাও দেখা যায়। এতে পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি রোগ-জীবাণু ছড়াচ্ছে এবং দুর্গন্ধের সৃষ্টি হচ্ছে।
শহরাঞ্চলে রাস্তার পাশে ডাস্টবিন থাকলেও তা সময়মতো পরিষ্কার করা হয় না। এর ওপর আবার অনেক নগরবাসীকে রাস্তার পাশে বা ফুটপাতে যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করতে দেখা যায়। ড্রেন বেয়ে এই নোংরা পানি রাস্তায় চলে আসে, যা পথচারীদের চরম দুর্ভোগের কারণ হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কদ্বীপের নালায় জমে থাকা মূত্রের উৎকট দুর্গন্ধে পথ চলা দায় হয়ে পড়ে। বৃষ্টির পানি ও নালার পানি মিশে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে পথিকের দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়। রাস্তার ধারে বা ফুটপাতে এভাবে প্রস্রাব করা কেবল লজ্জাহীনতা ও অসভ্যতার বহিঃপ্রকাশই নয়, বরং এটি একটি কবিরা গোনাহও বটে।
ইসলামের দৃষ্টিতে পরিচ্ছন্নতা কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, এটি ঈমানের অন্যতম একটি শাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "ঈমানের সত্তরোর্ধ্ব কিংবা ষাটোর্ধ্ব শাখা রয়েছে। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম শাখা হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা আর সবচেয়ে সাধারণ শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়া।" (বোখারি : ৯, মুসলিম : ৩৫)। অর্থাৎ ঈমানের সর্বনিম্ন দাবি হলো চলার পথকে সাধ্যমতো কষ্টমুক্ত রাখা। পথের কষ্ট বিভিন্ন উপায়ে হতে পারে— কোনো গর্তের কারণে পা মচকে যাওয়া, পড়ে থাকা ভাঙা কাচ বা কাঁটা পায়ে বিঁধে যাওয়া, ইটের টুকরায় হোঁচট খাওয়া, কিংবা ফলের খোসা ও পলিথিনে পা পিছলে পড়ে যাওয়া। এমনকি দুর্গন্ধ বা দৃষ্টিকটু কোনো বিষয়ও মানুষের কষ্টের কারণ হতে পারে। ইমাম নববি (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, "কষ্ট দ্বারা উদ্দেশ্য, পাথর, মাটির টুকরো, কাঁটাসহ কষ্টদায়ক সবকিছু।" (শরহু মুসলিম লিন নববি : ২/৬)। তাই পথচারীর চোখ ও পায়ের জন্য অস্বস্তিকর এমন সবকিছুই রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলা উচিত।
পথের কষ্ট দূর করাকে ইসলামে সদকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যকে অর্থ সাহায্য করার পাশাপাশি এটিও একটি সহজ ও গুরুত্বপূর্ণ সদকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "পথের কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে দেয়া সদকা।" (মুসলিম : ১০০৯)। তিনি আবু জর গিফারি (রা.)-কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, "রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা, হাড্ডি সরানোও তোমার জন্য একটি সদকা।" (তিরমিজি : ১৯৫৬)।
সামান্য এই আমলটি মানুষের পরকালীন মুক্তির কারণও হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "এক ব্যক্তি রাস্তায় চলতে চলতে একটি কাঁটার ডাল পেল, সে সেটিকে সরিয়ে দিল। আল্লাহ তার এ কাজের কদর করলেন এবং তাকে পাপমুক্ত করে দিলেন।" (মুসলিম : ৫০৪৯)। অন্য এক হাদিসে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেন, "এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে চলার সময় রাস্তায় কাঁটাদার গাছের একটি ডাল পেল। তখন সেটাকে রাস্তা হতে অপসারণ করলে আল্লাহ তার এ কাজকে কবুল করে নিলেন। ফলে তাকে ক্ষমা করে দিলেন।" (বোখারি : ৬৫২)। অনেকেই মনে করেন রাস্তা পরিষ্কার রাখা কেবল সরকারি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজ। কিন্তু একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে এটি আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। পথ থেকে কষ্টদায়ক কিছু সরানো আমাদের পাপমুক্তির ও কেয়ামতের দিন নাজাত পাওয়ার উসিলা হতে পারে।





