এইচএসসি পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফলে জিপিএ-৫ পেয়েছেন টাঙ্গাইলের মেধাবী শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম। ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষা দেওয়া এই শিক্ষার্থীর এমন সাফল্য পরিবারে কোনো আনন্দের বার্তা আনতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির কোচিং করতে ঢাকায় গিয়ে অপহৃত হওয়ার পর গত ৬ অক্টোবর তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। ফল প্রকাশের পর ছেলে হারানোর বেদনায় স্বজনদের শোকের ছায়া আরও ভারী হয়ে উঠেছে।
রাকিবুলের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদিরআটা গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের কৃষক খাদেমুল ইসলাম ও জোহুরা বেগম দম্পতির সন্তান। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী রাকিবুল সবসময় শ্রেণিকক্ষে প্রথম হতেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা নিয়ে আইনজীবী হওয়া। সেই স্বপ্ন পূরণের অংশ হিসেবেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিংয়ের জন্য তিনি ঢাকায় যান এবং পূর্ব শেওড়াপাড়ায় বন্ধুদের সঙ্গে একটি মেসে থাকতে শুরু করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার দিকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি রাকিবুলের নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে কোচিংয়ের শিট দেওয়ার কথা বলেন। রাকিবুল তখন মেসে থাকা বন্ধু ইসমাইল ও বুলবুলকে বাইরে যাওয়ার কথা বলে বের হন, কিন্তু আর ফিরে আসেননি। ওই দিন রাত ১২টা ২৩ মিনিটে রাকিবুলের বড় ভাই তাঁর মোবাইলে ফোন করলে এক ব্যক্তি ফোন ধরে রাকিবুলকে ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। এর পরই রাকিবুলের দুটি ফোন নম্বরই বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে যোগাযোগ করে হুমকি দেওয়া হলে পরিবারের পক্ষ থেকে ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু টাকা পাওয়ার পরপরই ওই ব্যক্তি সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।
নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় রাকিবুলের বড় ভাই জহিরুল ইসলাম বাদী হয়ে গত ৫ অক্টোবর ঢাকার কাফরুল থানায় অপহরণ ও অর্থ আদায়ের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। মামলার পরই ওই দিন সন্ধ্যায় রাজধানীর শুক্রাবাদ এলাকা থেকে আবদুল্লা আল মামুন ওরফে মামুন সরকার নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে মামুনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে গত ৬ অক্টোবর মাটির নিচে কার্টনে ভর্তি অবস্থায় রাকিবুলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাফরুল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শ্যামল কুমার হালদার জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামি মামুন স্বীকার করেছেন যে ১৬ সেপ্টেম্বরই রাকিবুলকে ধানমন্ডির একটি বাসায় নিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর লাশ টেপ দিয়ে মুড়িয়ে একটি কার্টনে ভরে রাত ১০টার দিকে অটোরিকশায় গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নেওয়া হয়। সেখান থেকে বাসে করে রংপুর হয়ে নীলফামারীর ডিমলা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছান মামুন। ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে কার্টনটি নিজের বাড়িতে নিয়ে সারা দিন সুপারিবাগানে লুকিয়ে রাখেন এবং সন্ধ্যার পর মাটিতে চাপা দেন। আদালতে আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এইচএসসি পরীক্ষার ফলে জিপিএ-৫ পাওয়ার খবরে রাকিবুলের মা পাগলপ্রায়, আর তাঁর শিক্ষক, সহপাঠী ও এলাকাবাসীও এমন মর্মান্তিক পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না। রাকিবুলের বড় ভাই জহিরুল ইসলাম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ভাই এত ভালো রেজাল্ট করেছে, তারপরও আমাদের কাঁদতে হচ্ছে। শুধু আমরা নই, শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ ওর সহপাঠীরাও শোকাহত। ভাই ভালো রেজাল্ট করেছে, আমাদের সবার মাঝে মিষ্টি বিতরণ করার কথা। কিন্তু তা করতে পারছি না। আমাদের কান্নাকাটি করতে হচ্ছে।’





