বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে বিশুদ্ধ বায়ুর আধার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এর উল্টো চিত্র উঠে এসেছে। সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন’ শীর্ষক এই বেজলাইন স্টাডিতে দেখা গেছে, বনের বিভিন্ন স্থানে বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫ এবং ক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ১০-এর মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে খুলনা, সাতক্ষীরা, শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে এই গবেষণা চালানো হয়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শরণখোলা রেঞ্জে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ১০২ মাইক্রোগ্রাম পিএম ২.৫ এবং ১১৪ মাইক্রোগ্রাম পিএম ১০ পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চাঁদপাই রেঞ্জে পিএম ২.৫ পাওয়া গেছে ৮৯ দশমিক ৩ মাইক্রোগ্রাম এবং পিএম ১০ পাওয়া গেছে ৯৮ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২ অনুযায়ী, পিএম ২.৫-এর মাত্রা ৩৫ এবং পিএম ১০-এর মাত্রা ৪৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে ২০২১ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বায়ুমান নির্দেশিকা অনুযায়ী, পিএম ২.৫ প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হলে সেটি অস্বাস্থ্যকর বাতাস। তবে সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও কার্বন মনোঅক্সাইডের মাত্রা এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোংলাকেন্দ্রিক কলকারখানা, বিশেষ করে সিমেন্ট কারখানা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা পোড়ানোর প্রভাব সুন্দরবনের বায়ুমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, পশুর চ্যানেলে সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার ও কয়লা খালাসের সময় যে ধুলা ও ফ্লাই অ্যাশ নির্গত হয়, তা বনের জন্য মারাত্মক হুমকি। এই দূষণ কেবল গাছপালার নয়, মৌমাছি ও প্রজাপতির মতো ছোট প্রাণীর পরাগায়ন প্রক্রিয়াকেও ব্যাহত করছে।
সিইজিআইএসের পরিবেশবিশেষজ্ঞ মুতাসিম বিল্লাহ জানান, শুষ্ক মৌসুমে ঝড়ো হাওয়া এবং আন্তদেশীয় বায়ুদূষণের কারণেও সুন্দরবনের বায়ুমান প্রভাবিত হয়। জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা অনুযায়ী, আন্তমহাদেশীয় দূষণের পরিমাণ ২১ শতাংশ। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার পরামর্শ দিয়েছেন যে, নৌবাহিনী ও বন বিভাগ চাইলে ক্লিংকার ও কয়লা পরিবহন ও খালাসের সময় সঠিক নজরদারি ও ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র এমনিতেই লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বায়ুদূষণ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে এবং মাটি ও জোয়ারের পানির পুষ্টিগুণ বদলে দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বুঝতে তাপমাত্রা, বাতাসের গতি ও দিকসহ অন্যান্য আবহাওয়াগত উপাদানের পাশাপাশি পিএম ২.৫ ও সালফার ডাই-অক্সাইডকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।





