পুলিশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন জনগণের আস্থা অর্জন: আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির

Published: October 8, 2026, 5:00 am

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া পুলিশ বাহিনী ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে এ বাহিনীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের আস্থা অর্জন করা। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এক সাক্ষাৎকারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, police সংস্কার, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পদায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন।

আইজিপি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের চেয়ে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ এক বছরের সঙ্গে বর্তমান সরকারের এক বছরের তুলনা করে তিনি জানান, দেশে খুন, ডাকাতি, দস্যুতা, দাঙ্গা, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, পুলিশ আক্রান্ত হওয়া এবং দ্রুত বিচার আইনের মামলাসহ ১০ ধরনের অপরাধের মধ্যে ৮টিই কমেছে। চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট মামলা হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০টি, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ লাখ ৮ হাজার 6৭৮টি। মামলা ১৪ হাজার ৮০২টি বাড়ার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, মানুষ এখন থানায় মামলা করার বেশি সুযোগ পাচ্ছে এবং পুলিশের অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার হচ্ছে।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর, ইসিবি চত্বর, আদাবর ও মোহাম্মদপুরে জমি ও বাড়ি দখলকে কেন্দ্র করে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাগুলো পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানান আইজিপি। তিনি বলেন, মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার মামলায় এ পর্যন্ত ১৯ জন সন্দেহভাজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইসিবি চত্বরের কাছে নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলার মামলায় এজাহারনামীয় আসামিসহ ৮ জনকে এবং আদাবরের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে জমি দখল ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। আইজিপি স্পষ্ট করে বলেন, মালিকানার বিরোধ নিষ্পত্তি হবে আইন অনুযায়ী, কোনো পেশিশক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ে জোরপূর্বক দখল সহ্য করা হবে না। দায়িত্ব পালনে কোনো পুলিশ সদস্যের অবহেলা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনার বিষয়ে আইজিপি জানান, পুলিশ অধিকাংশ ঘটনায় জড়িতদের পরিচয় নিশ্চিত করে অনেককে আইনের আওতায় এনেছে। যেমন কেরানীগঞ্জের এক মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণের পর আরও অনেকগুলো ঘটনা ঘটলে পুলিশ ১৭-১৮ জনকে গ্রেপ্তার এবং অনেক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারও করেছে। এ প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় এখানে যেকোনো অপরাধমূলক তৎপরতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের ১৭ বছরের কার্যক্রম থেকে দেশের মানুষ মুক্ত হতে পেরেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশকে অকার্যকর করার জন্য অনলাইনে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তবে তাদের সেই সক্ষমতা নেই। অন্যান্য বাহিনীর সহায়তায় পুলিশ মানবাধিকার রক্ষা করে এসব প্রতিরোধ করতে সক্ষম হচ্ছে।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এখন প্রতিক্রিয়াশীল পুলিশিংয়ের পরিবর্তে প্রতিরোধমূলক পুলিশিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছে। জন-আস্থা অর্জনে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে দেশজুড়ে সচেতনতামূলক সভা করা হচ্ছে। এর মধ্যে মাদক প্রতিরোধে ২ হাজার ৪৬৫টি, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে ৪ হাজার ৫০৪টি, মব সহিংসতা প্রতিরোধে ৫৭৪টি, ইভ টিজিং প্রতিরোধে ৩০৮টি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ৯৯১টি, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ১২৮টি, নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে ৭৯টি এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে ৫৪৮টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া উগ্রবাদ প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত ৩৭৪টি সভা করা হয়েছে। আইজিপি বলেন, শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং অপরাধের হার হ্রাস, অভিযোগপত্রের মান এবং আদালতের ফলাফলের ভিত্তিতে পুলিশের সাফল্য মূল্যায়ন করা উচিত।

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি ও বাহিনীর পুনর্গঠন নিয়ে আইজিপি বলেন, ৫ আগস্টের পর পুলিশ বাহিনী সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল এবং তাদের মনোবল ভেঙে গিয়েছিল। এখন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়ে শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলোর অধিকাংশ সংস্কার করা হয়েছে এবং নতুন যানবাহন যুক্ত করে দাপ্তরিক কাজ পুরোদমে চলছে। লুণ্ঠিত অস্ত্রের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা বাকি রয়েছে। বিগত ১৭ বছরের অভ্যন্তরীণ বৈষম্যগুলোও দূর করা হয়েছে। তবে জনগণের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে পুলিশ এখন পর্যন্ত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সফল হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

থানাগুলোকে সেবাবান্ধব করতে দেশের সব মডেল ও সদর থানাকে 'জিরো কমপ্লেন' বা অভিযোগশূন্য করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ওসিবাহিনীদের জনবান্ধব আচরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ওসির মামলা গ্রহণের ক্ষমতা অপব্যবহারের কিছু অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মডেল থানাগুলোতে আগত সেবাগ্রহীতারা তাদের সন্তুষ্টির বিষয়ে লিখিত মন্তব্য রেখে যাওয়ার প্রথা চালু করা হয়েছে।

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে পুলিশের বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে আইজিপি বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের স্বাধীন তদন্তের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যেকোনো অপরাধমূলক দায়ের ক্ষেত্রে শুধু মাঠপর্যায়ের সদস্য নয়, নির্দেশদাতা বা পরিকল্পনাকারীদেরও তদন্তের আওতায় আনা হবে। জুলাই আন্দোলনের সময় গুম ও অপহরণের অভিযোগে পুলিশের অন্তত ১৫০ জন কর্মকর্তাকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে, যাদের অনেকে কারাগারে আছেন এবং কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও এ বিষয়ে অগ্রগতি হচ্ছে। আইজিপি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩৫ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ জনকে চাকরিচ্যুত, ২৭ জনকে অব্যাহতি, ২৭ জনকে বিভিন্ন শাস্তি, ৯ জনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ২২ জনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

পদায়নে রাজনৈতিক তদবির ও ওসিবাহিনীদের বদলিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ বন্ধ করতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রী, এমপি বা যেকোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির তদবির এলে তা কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন করা হয়। আইজিপি দাবি করেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কোনো নেতা বা মন্ত্রী পুলিশকে কোনো অবৈধ আদেশ দিচ্ছেন না এবং পুলিশ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে। হয়রানিমূলক মামলা বা বেআইনি গ্রেপ্তার ঠেকাতে তদন্ত কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্ট তথ্য যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে আইজিপি জানান, পদায়নের জন্য ফিটলিস্ট তৈরির কমিটিসহ অধিকাংশ আশু সুপারিশ কার্যকর করা হয়েছে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-কে আরও শক্তিশালী করতে ৫০০টি ওয়ার্কস্টেশনে সম্প্রসারণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ ভেরিফিকেশন সহজ করা এবং তল্লাশির সময় পুলিশের পরিচয় নিশ্চিত করার বিষয়গুলো কার্যকর করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের আবাসনসংকট দূর করতে জেলা পর্যায়ে আবাসিক ভবন নির্মাণের প্রকল্প চলমান রয়েছে, যা তাদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হবে। আগামী ছয় মাসে জনগণের আস্থা অর্জন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আইজিপি বলেন, পুলিশ নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো ফলাফলের দায় নেওয়া এবং ঘাটতি সংশোধন করা।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo