প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের নিউইয়র্ক সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকেন্দ্রিক কর্মসূচির পাশাপাশি ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সফর শেষে নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
ব্রিফিংয়ে মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, আন্তর্জাতিক শান্তি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। চার দিনের এই ব্যস্ত সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি, জাতিসংঘের ফাঁকে চারটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান, ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা ও জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
সফরের বিশেষ কিছু কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা জানান, গত বৃহস্পতিবার সকালে ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে জেপি মরগান চেজ আয়োজিত একটি প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ ও তা বাড়ানোর উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এরপর ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরে আসাকে স্বাগত জানানো হয় এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় দেশের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে দেশে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
একই দিন বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা, জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি, জ্বালানি ও খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। এই তিন দেশের নেতারাই প্রধানমন্ত্রীকে নিজ নিজ দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী জানান, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ।
মাহদী আমিন আরও জানান, সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটিতে সরাসরি বক্তব্য দিয়েছেন। সফরকালে তিনি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার এবং গেটস ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশের উদ্যোগে রোহিঙ্গা সংকট এবং মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য ও মিডওয়াইফারি বিষয়ে দুটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানেও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী。
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমানও এই সফরে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি আটটি উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং এর মধ্যে চারটিতে বক্তব্য দেন। বিশেষ করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্ল্যাটফর্ম অব উইমেন লিডারস, ফার্স্ট স্পাউসেস ডায়ালগ এবং মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, ছোট একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা হয়েছে। চার দিনে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা প্রায় ৮০টি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর বিশ্বমঞ্চে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাধারণ পরিষদে তাঁর ভাষণে দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারের পাশাপাশি বিশ্বশান্তি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।
এই সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মর্তুজা, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপস্থায়ী প্রতিনিধি এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান এবং প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনিসহ প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তারা।





