জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ ও তার সফরের বিভিন্ন দিক নিয়ে আজ বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি জানান, অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এই সফরে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে একদিন এবং ফিরতে একদিন সময় লেগেছে, আর মাঝে চার দিন তিনি সেখানে অবস্থান করেছেন। এই স্বল্পতম সময়ের সফরে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০টি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন এবং এর বাইরেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। তিনি বিশ্বের ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, ৬টি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান এবং বিশ্বমঞ্চে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছেন।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে (টার্কিশ এয়ারওয়েজ ও এমিরেটস এয়ারলাইন্স) যাতায়াত করেছেন। তার প্রতিনিধিদলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা মিলিয়ে সদস্যসংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫ জন। মাহ্দী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রতিনিধিদলের সদস্যরা চার দিনে ৮০টিরও অধিক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ততার কারণে প্রতিনিধিদলের একটি অংশ দেশে ফিরে এলেও মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সমন্বয়ে একটি টিম ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বাড়াতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
জাতিসংঘ সদরদপ্তরে প্রধানমন্ত্রীর ৮টি মূলধারার কর্মসূচির মধ্যে ছিল সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী পর্ব ও ঐতিহাসিক ভাষণ। ভাষণে তিনি বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং নবনির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। এছাড়া তিনি জাতিসংঘের মহাসচিবের প্রাতরাশ সংবর্ধনা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের আমন্ত্রণে আয়োজিত বিশেষ সংবর্ধনায় অংশ নেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক দুটি উচ্চপর্যায়ের ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি শিল্পায়নে গ্রিন ফ্যাক্টরি বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার ওপর জোর দেন। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা ও মিডওয়াইফারি সংক্রান্ত ইভেন্টে তিনি ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের সরকারি নীতি ঘোষণা করেন।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রত্যাবাসনে চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানান। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ও আন্তর্জাতিক সহায়তায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা হয়েছিল। এছাড়া ফিলিস্তিনের প্রতি বাংলাদেশের অটল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ওয়াকআউট করে।
মাহ্দী আমিন জানান, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ১১টি দেশের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সমতা ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। মার্কিন বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বন্ডসহ নতুন আর্থিক ইনস্ট্রুমেন্ট চালুর বিষয়ে সংলাপ হয়েছে এবং বোয়িং গ্লোবালের সঙ্গে নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিতে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।
ডা. জুবাইদা রহমান জাতিসংঘে ৮টি কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে নারী নেতৃত্ব ও মা-শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের দর্শন তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের জাতিসংঘে নিয়োগের বিষয়ে অপপ্রচার নাকচ করে উপদেষ্টা জানান, তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব মেধা ও যোগ্যতায় জাতিসংঘের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় পি-৩ পদে নিয়োগ পেয়েছেন, যার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। পরিশেষে মাহ্দী আমিন বলেন, এই সফর বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয়কে বিশ্বদরবারে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।





