সাত বছরের ইরফানের শৈশব কাটার কথা ছিল রংপেনসিল আর বন্ধুদের সঙ্গে খেলার মাঠে, কিন্তু এখন তার হাতে ক্যানুলা। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগে ব্লাড ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছে সে। নেত্রকোনার দুর্গাপুরের এই পরিবারটি গত এক বছরে সন্তানের চিকিৎসায় ১৫ লাখ টাকারও বেশি খরচ করেছে। প্রতি মাসে কেমোথেরাপি, ওষুধ ও অন্যান্য বাবদ গড়ে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। ডোনার না থাকলে রক্ত কেনা ও মলিকিউলার রেসিডুয়াল ডিজিজ পরীক্ষায় গুনতে হয় আরও হাজার হাজার টাকা।
একই রকম অনিশ্চিত জীবন সাবেক নির্মাণশ্রমিক ইমারুলের। দুই কিডনি বিকল হওয়ায় ১০ বছর ধরে সপ্তাহে দুবার ডায়ালিসিস করতে হচ্ছে তাকে। চিকিৎসায় ৩০ লাখ টাকা খরচ করে তিনি এখন জমিজমা ও বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব। ঋণের ভারে জর্জরিত এই পরিবারটির প্রতি সপ্তাহে ওষুধ ও যাতায়াত বাবদ ২০ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়, যা জোগাতে না পেরে অনেক সময় চিকিৎসা বন্ধ রাখতে হয় তাদের।
ইরফান ও ইমারুলের মতো অসংখ্য রোগী ক্যানসার, হৃদরোগ, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোক ও থ্যালাসেমিয়ার মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছেন। চিকিৎসার লাগামহীন ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবারগুলো সঞ্চয় শেষ করছে, জমিজমা বিক্রি করছে এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। পরিবারের উপার্জনের মানুষটি অসুস্থ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ৬১ লাখ মানুষ চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। দেশের মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের ৭৯ শতাংশই বহন করতে হয় রোগী ও তাদের পরিবারকে। অর্থাৎ, চিকিৎসায় প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৭৯ টাকা আসে রোগীর পকেট থেকে। বর্তমানে একটি পরিবারের গড় মাসিক চিকিৎসাব্যয় ৩,৪৫৪ টাকা, যা মোট মাসিক ব্যয়ের প্রায় ১১ শতাংশ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২২ শতাংশ মানুষের প্রতি মাসে চিকিৎসাসেবা প্রয়োজন হলেও ৬৫ শতাংশই চিকিৎসার বাইরে থাকেন। গ্রামে এ হার ৬৮ শতাংশ, শহরে ৫৯ শতাংশ। পরিবারপ্রতি মাসিক চিকিৎসাব্যয় শহরে গড়ে ৪,১৯২ টাকা, গ্রামে ৩,১০৯ টাকা।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েও একটি পরিবারকে বছরে গড়ে ৪২ হাজার ৪৮৩ টাকা খরচ করতে হয়। এর মধ্যে সার্জারিতে গড়ে ২৬ হাজার ১৪২, ওষুধে ১১ হাজার ২৮৭ এবং শয্যা ভাড়ায় ১০ হাজার ৭৪৩ টাকা ব্যয় হয়। ধনীরা আয়ের ৫ শতাংশ চিকিৎসায় ব্যয় করলেও দরিদ্রদের ক্ষেত্রে তা ৩৫ শতাংশ। ক্যানসারের চিকিৎসায় গড় ব্যয় দুই লাখ ২৪ হাজার টাকা, যা সর্বোচ্চ আট লাখ ৪৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি ও যন্ত্রপাতি অচল থাকার কারণে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।
জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতে আট থেকে দশ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ময়মনসিংহের ত্রিশালের রিনা আক্তার ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার খরচ জোগাতে পাঁচটি গরু, গয়না ও জমি বিক্রি করে পথের ফকির হয়েছেন। হৃদরোগে আক্রান্ত আলিম হোসেনও রিং পরাতে ব্যয় করেছেন ছয় থেকে সাত লাখ টাকা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসার ব্যয় কমাতে সরকারি হাসপাতালে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যবীমা ও সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানো জরুরি। বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন জানান, ক্যানসার অনেক পরিবারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। পরিস্থিতি বদলাতে জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা তহবিল ও ভর্তুকিমূল্যে ওষুধ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সাবেক স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।





