মানবজাতির কল্যাণে মহান আল্লাহ যা কিছু হালাল করেছেন, তা ব্যাপক অর্থে ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন। আর যা হারাম করেছেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তার বদলে পবিত্র ও বৈধ বিকল্প নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যেমন ব্যভিচারকে হারাম করে বিয়ের বিধান এবং সুদকে নিষিদ্ধ করে ব্যবসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর হালাল করা বিষয়কে হারাম করা কিংবা তাঁর হারাম বিধানকে হালাল করার সাধ্য কারও নেই। তবে কোনো ব্যক্তি যদি বৈধ ব্যবসার মধ্যে হারামের সংমিশ্রণ ঘটায়, তবে সেই হালাল ব্যবসাও হারামে রূপ নেয় এবং এর পরিণতি হিসেবে পরকালে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হয়। এ বিষয়ে সুরা বাকারা-এর ২৭৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, যারা সুদ খায়, তারা শয়তানের স্পর্শে পাগল হওয়া ব্যক্তির মতো উঠবে। কারণ তারা দাবি করত ব্যবসা সুদের মতোই। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন। যাদের কাছে রবের উপদেশ পৌঁছানোর পর তারা বিরত হলো, অতীতে যা ঘটেছে তা আল্লাহর ওপর ন্যস্ত; কিন্তু যারা পুনরায় সুদে ফিরে যাবে, তারা স্থায়ী আগুনের অধিবাসী হবে।
বর্তমান সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভেজাল মেশানো, প্রতারণা ও মিথ্যা শপথের বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রথাগত কেনাবেচার পাশাপাশি ডিজিটাল পরিকাঠামোতেও অসাধু উপায়ে অর্থ উপার্জনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অর্থ উপার্জনের জন্য একজন ব্যবসায়ী সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে পরিবার ও নিজের জন্য খাদ্য ও সম্পদ নিয়ে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু অর্জনের উপায়টি হারাম হওয়ার কারণে সেই পরিশ্রমের সম্পূর্ণ অর্থ ও খাদ্যই অন্যায্য হয়ে দাঁড়ায়। কষ্টিপাথরে গড়া সেই পরিশ্রম পরকালে সওয়াবের বদলে আমলনামায় পাপ হিসেবে যুক্ত হবে। বুখারি শরিফের ২০৫৯ নম্বর হাদিসে নবীজি (সা.) পূর্বেই সতর্ক করে বলেছিলেন, এমন এক সময় আসবে যখন মানুষ তোয়াক্কা করবে না যে তার উপার্জিত সম্পদ হালাল নাকি হারাম।
অসৎ ব্যবসায়ীদের প্রথম বড় বৈশিষ্ট্য হলো ওজনে কম দেওয়া। সুরা মুতাফফিফিনের ১-৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা মন্দ পরিণামের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা অন্যের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পুরোটা গ্রহণ করে কিন্তু অন্যকে মেপে বা ওজন করে দেওয়ার সময় কম দেয়, তাদের জন্য ধ্বংস। নিজেদের ক্রয়ের সময় শতভাগ বুঝে নিয়ে বিক্রির সময় সামান্য কম দেওয়াও অন্যের হক নষ্ট করার শামিল। ওজনে এক দানা পরিমাণ কম দিলেও কেয়ামতের দিন তা প্রাপকের অধিকার হিসেবে থাকবে এবং তা পণ্য দিয়ে নয়, আমলনামার সওয়াব হস্তান্তরের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। সুরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে পরস্পরের সম্মতিতে ব্যবসা ছাড়া অন্যায়ভাবে ধন-সম্পদ না খাওয়ার নির্দেশ রয়েছে। একই সঙ্গে সুরা নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ন্যায়পন্থা, অনুগ্রহ ও নিকটাত্মীয়দের হক আদায়ের আদেশ এবং অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
দ্বিতীয় অনৈতিক বৈশিষ্ট্য হলো ক্রেতার ওপর জুলুম করা বা সুযোগ বুঝে অস্বাভাবিক মূল্য হাঁকানো। উদাহরণস্বরূপ, ১০০ টাকায় কেনা পণ্য বহুগুণ বেশি দামে বিক্রি করা ক্রেতার ওপর একধরনের অত্যাচার। সুরা আনআমের ৫৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, জালেমরা কখনো সফলকাম হয় না এবং সুরা শুআরার ২২৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, জালেমরা শিগগিরই জানতে পারবে তাদের চূড়ান্ত পরিণতি কোথায় হবে। মুসলিম শরিফের ৬৭৩৭ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, তিনি নিজের জন্য জুলুম হারাম করেছেন এবং বান্দাদের পরস্পরের মধ্যেও তা হারাম করেছেন, তাই কারও ওপর জুলুম করা যাবে না।
পণ্যের ত্রুটি গোপন রেখে বিক্রি করা অসাধু ব্যবসার তৃতীয় রূপ। ভালো পণ্যের ভিড়ে দু-একটি ত্রুটিযুক্ত পণ্য চালিয়ে দেওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সুনানে ইবনে মাজাহ-এর ২২৪৭ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি পণ্যের দোষ না জানিয়ে বিক্রি করে, সে সর্বদা আল্লাহর গজব ও ফেরেশতাদের অভিশাপের মধ্যে থাকে। এছাড়া বুখারি শরিফের ২০৭৯ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, ক্রেতা-বিক্রেতা সত্য বললে ও স্পষ্ট ধারণা দিলে তাদের ব্যবসায় বরকত লাভ হয়, কিন্তু মিথ্যা বলা ও দোষ গোপন করার মাধ্যমে ব্যবসার বরকত সম্পূর্ণ মুছে যায়।
চতুর্থ ক্ষতিকর আচরণ হলো মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি করা। পোশাক ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়, যা বাংলাদেশে বিশেষ করে রমজান ও ঈদের কেনাকাটার সময় তীব্র হয়। কেনা দামের মিথ্যা তথ্য দিয়ে বা 'একবারে কেনা দামে দিয়ে দিচ্ছি' বলে ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করা নৈতিকতার চরম অবক্ষয়। মুসলিম শরিফের ১০৬ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) বাণী দিয়েছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তিন ব্যক্তির সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে ফিরে তাকাবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থাকবে। এদের একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে মিথ্যা কসম খেয়ে নিজের ব্যবসায়িক পণ্য বিক্রি করে।





