যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশের খ্যাতনামা ব্র্যান্ডের নাম ও লোগো ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছিল নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট বা খাদ্য পরিপূরক। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার তেঁথুলিয়া মাঠের একটি নিভৃত আধাপাকা বাড়িতে গড়ে তোলা হয় এই অবৈধ কারখানা। সেখানে তৈরি পণ্য মূলত অনলাইনে প্রদর্শন করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রাহকদের কাছে পাঠানো হতো। যৌথ অভিযানে কারখানাটির সন্ধান পেয়ে আনুমানিক দেড় কোটি টাকা মূল্যের নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত ও প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর বাঘা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহানের নেতৃত্বে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও বাঘা থানা-পুলিশ যৌথভাবে কারখানাটিতে অভিযান চালায়। উপস্থিত কর্মকর্তা ও স্থানীয় ব্যক্তিদের উপস্থিতিতেই দুই ট্রাক পরিমাণ নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট আগুন দিয়ে পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হয়। আরও তিন ট্রাক মালামাল নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। কারখানা থেকে পণ্য তৈরির সরঞ্জাম, কার্টন ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের লেবেলযুক্ত বোতল উদ্ধার করা হয়। ভারী হওয়ার কারণে ট্যাবলেট তৈরির মূল যন্ত্রটি সরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় তা ঘটনাস্থলেই অকেজো করে দেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা।
এই কারখানার সন্ধান মেলে মূলত রাজধানীর বনানী থানা-পুলিশের একটি তদন্তের সূত্রে। 'কারকুমা' নামের একটি পণ্যের জালিয়াতি সংক্রান্ত অভিযোগের পর গত বুধবার সন্ধ্যায় বনানী থানা-পুলিশের টিম বাঘার এই কারখানায় অভিযান চালায়। তারা জুলাই মাসের একটি মামলার দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে ঢাকায় নিয়ে যায় এবং জব্দ করে কারখানাটিতে থাকা 'কারকুমা'র নকল মালামাল। একই সাথে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় মোট ১১ জনকে। এদের মধ্যে পাঁচজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের লিখিত মুচলেকা নিয়ে স্বজনদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি চারজনকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর ৪১ ধারায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১ লাখ টাকা জরিমানা করে কারখানাটি সিলগালা করা হয়। জরিমানা আদায়ের রশিদে স্বাক্ষর করেন চারঘাট উপজেলার চকলক্ষ্মীপুর গ্রামের খালিদ হাসান। এছাড়া সাক্ষ্য দেন কারখানার শ্রমিক দিলু মিয়া ও হাসমতসহ অন্য সহকর্মীরা, যাদের সিংহভাগের বাড়ি নাটোর জেলায়।
অভিযানে উদ্ধার হওয়া পণ্যের মোড়ক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একেকটি বোতলে বিভিন্ন দেশের তথ্য জালিয়াতি করা হয়েছে। কোথাও উৎপাদনের স্থান যুক্তরাষ্ট্র লেখা থাকলেও বিতরণকারীর ঠিকানা দেওয়া হয়েছে ময়মনসিংহের ভালুকা। আবার কোনোটিতে জাপানি কোম্পানির নাম থাকলেও সিরিয়ালে লেখা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নাম। প্রতি প্যাকেটে দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা মূল্যের দাম হাঁকানো হতো। যেমন 'কারকুমা'র প্যাকেটে দুই হাজার ১৭০ টাকা, কোরিয়ান লেবেলে দুই হাজার ৩৯৯ টাকা এবং মালয়েশিয়ার লেবেলযুক্ত পণ্যে দুই হাজার ২৯০ টাকা মূল্য লেখা ছিল। মোড়কে সরাসরি 'ওষুধ' শব্দটি না থাকায় তাৎক্ষণিক নিয়মিত মামলা করা সম্ভব হয়নি বলে জানান ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার তত্ত্বাবধায়ক মেহেদী আফজাল। তবে অনুমোদনহীন ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য জরিমানা ও সিলগালা করা হয়েছে এবং নিয়মিত মামলার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আধাপাকা বাড়িটি সব সময় বাইরে থেকে তালাবদ্ধ থাকত। পেছনের একটি গোপন দরজা দিয়ে লোকজন যাতায়াত করত। ভেতরে শোবার খাট, খাওয়ার থালাবাসন ও নিজস্ব নলকূপ বসানো ছিল। বাড়িটির মালিক হায়দার আলী চাকরিসূত্রে ঢাকায় বসবাস করেন। তাঁর পরিবার জানায়, প্রায় ছয় মাস আগে নাটোরের বড়াইগ্রাম এলাকার রেজাউল করিম নামের এক ব্যক্তি মাসিক ৮ হাজার টাকায় বাড়িটি ভাড়া নেন। ভাড়া নেওয়ার সময় তিনি 'নাটোর ভেষজ মার্ট' নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি জমা দিয়েছিলেন, যার মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত। বাড়ির মালিক বা তাঁর স্বজনেরা ভেতরে নকল ওষুধ তৈরির বিষয়ে কিছুই জানতেন না বলে দাবি করেছেন। ঘটনার পর থেকে ভাড়াটিয়া রেজাউল করিমের মুঠোফোন বন্ধ রয়েছে।





