চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক ও আধুনিক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে দুবাইভিত্তিক গ্লোবাল অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড। গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় উভয়পক্ষের মধ্যে এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রতিষ্ঠানটি টার্মিনালের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বুঝে নেবে। ১৫ বছর মেয়াদী এই চুক্তিতে পারস্পরিক বনিবনা সাপেক্ষে নবায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, বাম রাজনৈতিক দল ও নাগরিক প্রতিনিধিরা এর তীব্র বিরোধিতা করে আসছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতৃত্বে অন্য কয়েকটি সংগঠন মিলে টানা ৯ দিন বন্দর অচল করে রাখা হয়েছিল। তারা ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটির দায়িত্ব দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালন করে। তবে সব প্রতিবাদ উপেক্ষা করে বর্তমান সরকার এই চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। যদিও শ্রমিক সংগঠনগুলো কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে, তবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ খুব একটা নেই বলে মনে করা হচ্ছে।
চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনাল আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি হালনাগাদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে বন্দরকে এককালীন পাঁচ কোটি ডলার দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে অপারেটরকে আর্থিক জরিমানার সম্মুখীন হতে হবে। চুক্তিতে টার্মিনাল পরিচালনার অধিকার, দায়-দায়িত্ব, পরিবেশ রক্ষা, মাশুল নির্ধারণ ও বিরোধ নিষ্পত্তির ধারা রাখা হয়েছে।
ব্যবসায়ী মহলে এই চুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিজিএমইএ পরিচালক মহিউদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, বন্দরের সেবার মান ও গতি বাড়লে ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়বে। এনসিটিতে এখন ঘণ্টায় ২৮ থেকে ৩০টি কনটেইনার ওঠানামা করা যায়। ডিপি ওয়ার্ল্ড এলে এই সংখ্যা ৪০ ছাড়াবে। এই তথ্য সঠিক হলে ব্যবসায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। সেবার মান বাড়াতে গিয়ে যদি আবার মাশুল বাড়ানো হয় তবে তার সুফল আসবে না। কম খরচে ভালো সেবা পেলে আমরা খুশি। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক জানান, চুক্তির বিষয়বস্তু সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে। তিনি বড় ধরনের চুক্তির আগে স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অফডক মালিকদের সংগঠন বিকডার সেক্রেটারি জেনারেল রুহুল আমিন শিকদার বিপ্লব জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের বর্ধিত অংশ হিসেবে পরিচিত বেসরকারি কনটেইনার ডিপো কর্তৃপক্ষ বা অফডক। শতভাগ রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণ ও ৬৪ ক্যাটাগরির আমদানি পণ্য হ্যান্ডলিং হয় ১৮টি অফডকে। সেই হিসেবে বন্দরের সঙ্গে তাদের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। তিনি আরও জানান, এখানে বন্দরের ভেতরে পণ্য ডেলিভারির অভিজ্ঞতা ডিপি ওয়ার্ল্ডের নেই। তাই এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে না পারলে সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার চুক্তির অধিকাংশ কাজ এগিয়ে রেখেছিল, তাই বর্তমান সরকারের পক্ষে সেখান থেকে পিছিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। তবে দেশের স্বার্থ রক্ষায় চুক্তির কিছু ধারায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের পিসিটি পরিচালনা করছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে ইন্টারন্যাশনাল, এবং লালদিয়া টার্মিনালের দায়িত্ব পেয়েছে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস। বন্দরের সাবেক সদস্য জাফর আলমের মতে, একাধিক আন্তর্জাতিক অপারেটরের উপস্থিতি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করবে, যা সেবার মান ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এই প্রক্রিয়ায় ১৩টি পয়েন্টের ওপর ভিত্তি করে এবং ৭৫ শতাংশ সক্ষমতা যাচাইয়ের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।





