মৌলভীবাজার সদর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত ধোবারহাট-শমসেরগঞ্জ বাজার। গ্রামের মেঠো পথ ধরে মানুষ মাছের ডালা, সবজির বোঝা ও পানের আঁটি নিয়ে জড়ো হন এই হাটে। কেউ হাঁস-মুরগি নিয়ে আসেন, আবার কেউ গরু নিয়ে আসেন বিক্রির উদ্দেশ্যে। সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার এই হাট বসে, যা দুই উপজেলার মানুষের জন্য অন্যতম বড় মোকাম হিসেবে পরিচিত। বাজারের অর্ধেক পড়েছে শ্রীমঙ্গলের মীর্জাপুর ইউনিয়নে এবং বাকি অর্ধেক সদরের আপার কাগাবলা ইউনিয়নে।
শত বছরেরও বেশি পুরোনো এই বাজারের মূল আকর্ষণ হাওর ও নদীর মাছ এবং স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত শাকসবজি। হাটের বিভিন্ন গলিতে ভিন্ন ভিন্ন পণ্যের পসরা সাজানো থাকে। সবজি, পান-সুপারি, হাঁস-মুরগি, শুঁটকি, ডিম এবং বেতের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী মেলে এখানে। সড়কের পাশে অনেকে হাইল হাওর থেকে সংগ্রহ করা কালো শালুক নিয়ে বসেন, যার কেজিপ্রতি দাম ৩০ টাকা। সবজির মধ্যে লাউ, লালশাক, কচুর মুখি, সিম ও টমেটোর প্রচুর জোগান থাকে। স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামের মতে, এই বাজার সবজির জন্য বেশি পরিচিত এবং পাহাড়ি বিন্নিগ্রাম, শেখের হিজড়া ও আদর্শগ্রামসহ আশপাশের এলাকা থেকে সবজি আসে। মৌলভীবাজার শহরের বড়হাট এলাকা থেকে ৪০০ টাকায় একটি গাছের ফল কিনেছেন তিনি।
বাজারটির বয়স নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ মনে করেন এটি ১০০ বছরের বেশি পুরোনো। সূচনাস্থল নিয়েও আছে দুই মত—কেউ বলেন গোপলা নদীর ওপারে, আবার কেউ বলেন পশ্চিমের কোনো টিলার ওপর এই হাট বসত। বর্তমানে হাটে তিন শতাধিক স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকান রয়েছে। অয়েছ আলীর মতো স্থানীয়রা জানান, আগে এটি টিলার ওপর বসত, বর্তমান স্থানটি বর্ষায় জলমগ্ন থাকত। তিনি বলেন, ‘২০-২৫ বছর আগেও টুকরিবোঝাই গাব লইয়া লাইন থাকত।’
মাছ ও সবজির পাশাপাশি এই হাটের অন্যতম পরিচয় ‘বাংলা পান’। কান্তি লাল ধর ও অর্জুন দত্তের মতো বিক্রেতারা জানান, টিলাভূমিতে চাষ করা এই পান পাইকাররা দূর-দূরান্ত থেকে এসে কিনে নিয়ে যান। এছাড়া গাবফল, যা মাছ ধরার জালে কষ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাও এখানে বিক্রি হয়। লুবন মিয়ার তথ্যানুযায়ী, প্রতি হাটবারে কম করেও ৩০-৩৫ লাখ টাকার কেনাবেচা হয়। হাটের বয়স ঠিক কত, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না।
প্রতিদিন বাজার খোলা থাকলেও হাটবারে সকাল ছয়টা-সাতটা থেকে পাইকারি বেচাকেনা শুরু হয়। সকালের বাজার ১০-১১টা পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং হাটবারে দুপুরের পর থেকে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় বাড়তে থাকে। শোলপুর গ্রামের পুরুষ মিয়া জানান, হাটবারে রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত বাজার সরগরম থাকে। সন্ধ্যার পর আলোর ঝলকানিতে শতবর্ষী এই হাট তার পুরোনো আমেজ ফিরে পায়।
খুচরা পান বিক্রেতা কান্তি লাল ধর (৬০) বলেন, ‘২৫ বছর ধরে আমি এই বাজারও পান বেচি।
রাত ১০টা-১১টার পর ধীরে ধীরে দোকানের ঝাঁপ নামতে শুরু করে।





