একজন শিক্ষককে ক্লাস থেকে সরিয়ে দিতে কতটুকু সময়ের প্রয়োজন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ সম্প্রতি প্রমাণ করেছে যে, মাত্র এক রাতের কম সময়েই এটি সম্ভব। প্রায় ৩৪ বছর ধরে পাঠদান করা একজন শিক্ষককে এক মঙ্গলবার মাস্টার্সের ক্লাসে এক শিক্ষার্থীর সাথে কথোপকথনের জেরে বৃহস্পতিবার জানানো হয় যে, তাঁর সব কোর্স অন্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ এই সিদ্ধান্তের আগে অভিযুক্ত শিক্ষকের সাথে কথা বলার বা ঘটনাটি জানার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এই ঘটনাটি কেবল একটি ক্লাসের বা বিভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো সিদ্ধান্ত দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য নজির হিসেবে কাজ করে। কয়েক মাস আগেও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের বিতর্কে দুইজন শিক্ষক চাকরি হারিয়েছিলেন। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর যে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, এই ধরনের ঘটনা সেই স্বপ্নের পরীক্ষা নিচ্ছে। বিতর্কটি কি কেবল নিকাব নিয়ে, নাকি শ্রেণিকক্ষটা আসলে কার—সেই প্রশ্নটিই এখানে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তিনি নিকাব ও পর্দার ধরন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে, শিক্ষক তাঁর ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, চোখ দেখা না যাওয়ায় শনাক্তকরণ ও যোগাযোগের অসুবিধার কথা বলেছিলেন তিনি। কোনটি সত্য, তা যাচাইয়ের জন্য কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। একজন শিক্ষার্থী কষ্ট পেয়েছেন এবং তিনি ক্লাস ছেড়েছেন, এটি বাস্তব। কিন্তু সেই ভুল সংশোধনের প্রক্রিয়ার চেয়ে ভুলকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানোই যেন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রক্রিয়াগত দিক থেকে দেখলে, অভিযোগ লিখিতভাবে আসার আগেই বিভাগের জরুরি সভা ডেকে ‘রায়’ প্রস্তুত করা হয়েছিল, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। প্রশাসন অভিযোগ গ্রহণ করলেও বিভাগকে থামায়নি বা কোনো তদন্ত কমিটির ঘোষণা দেয়নি। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় যদি ফেসবুকের রায়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা কোথায় থাকে?
শ্রেণিকক্ষ হলো সংলাপের জায়গা, যেখানে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু যদি শিক্ষক মনে করেন তাঁর প্রতিটি বাক্য রেকর্ড করা হচ্ছে এবং ফেসবুকে খণ্ডিতভাবে প্রকাশ করা হবে, তবে শিক্ষা ও মুক্ত আলোচনার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। পোশাকে পরিচয় শনাক্ত না হওয়া নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা জরুরি, যা কোনো ব্যক্তিগত বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রশাসনের নীরবতার সুযোগে একটি নির্দিষ্ট ছকে উগ্র রাজনীতির অংশ হিসেবে শিক্ষকদের নিশানা করা হচ্ছে, যা শিক্ষা ইকোসিস্টেমের জন্য হুমকিস্বরূপ। যথাযথ প্রক্রিয়ার অভাব কেবল অভিযুক্ত শিক্ষকের ক্ষতি করছে না, বরং অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর মর্যাদাকেও মিছিলের স্লোগান ও রাজনীতির পুঁজি বানিয়ে ফেলছে।





