আয়ের বড় অংশই চলে যায় বাড়িভাড়ায়, ৪ বছরে বেড়েছে ২৭ শতাংশ

Published: October 5, 2026, 7:31 am

রাজধানী ঢাকায় সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের একটি বড় অংশই চলে যাচ্ছে বাসাভাড়ার পেছনে। আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বাসা খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে দেশে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। তবে বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় ভাড়া বৃদ্ধির হার সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি।

বেসরকারি চাকরিজীবী শাহাদাত হোসেনের কথাই ধরা যাক। তাঁর মাসিক বেতন ৩৯ হাজার টাকা। সম্প্রতি বিয়ে করার পর মোহাম্মদপুর বা এর কাছাকাছি এলাকায় দুই কক্ষের একটি বাসা খুঁজছেন তিনি। গত এক সপ্তাহে আদাবর, শেখেরটেক ও মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের আশপাশে ঘুরেও ১৮ হাজার টাকার নিচে কোনো বাসা পাননি। এই ভাড়ার সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ বিল এবং সার্ভিস চার্জ যোগ করলে মোট খরচ দাঁড়াবে ২০ হাজার টাকার বেশি। শাহাদাত হোসেন জানান, বেতনের অর্ধেক যদি বাসাতেই চলে যায়, তবে এই দুর্মূল্যের বাজারে চলা অসম্ভব। বাধ্য হয়ে তিনি এখন অফিস থেকে দূরে কম ভাড়ার বাসা খোঁজার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাতে যাতায়াতে কষ্ট হলেও কিছু টাকা বাঁচানো যায়।

একই পরিস্থিতির মুখোমুখি ঢাকার পূর্ব গোড়ানের বাসিন্দা ফোজায়েল আহমেদ। চার বছর আগে তিনি তিন কক্ষের একটি ফ্ল্যাট ২০ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়েছিলেন। তিন দফায় বৃদ্ধি পেয়ে সেই ভাড়া এখন দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার টাকায়, যা প্রায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি। এর বাইরে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিলও বেড়েছে। বাড়তি এই খরচের চাপ সামলাতে তিনি অন্য খাতের খরচ কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাস ২০২৫’ অনুযায়ী, বৃহত্তর ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ বসবাস করছেন, যা ঢাকাকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনবহুল নগরে পরিণত করেছে। এই বিপুল জনসংখ্যার সিংহভাগই ভাড়া বাসায় থাকেন। ভাড়াটেদের সুরক্ষায় সরকার ১৯৯১ সালে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন করলেও, প্রয়োজনীয় বিধিমালা তৈরি না হওয়ায় আইনটি কার্যত অকার্যকর রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান এই বিষয়ে বলেন, ঢাকায় আবাসন চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় ভাড়া বেশি। অনেক সময় বাড়িওয়ালাদের ভাড়া বাড়ানোর পেছনে যৌক্তিক কারণ থাকলেও, সেই বৃদ্ধির হার আসলেই যৌক্তিক কি না বা তা ভাড়াটেদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে কি না, তা তদারকি করার কোনো ব্যবস্থা নেই। এই জটিলতা দূর করতে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি।

বিবিএসের ত্রৈমাসিক বাসাভাড়া সূচক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত জাতীয়ভাবে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। তবে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এই হার আরও বেশি। রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শেখেরটেক, মগবাজার, ইস্কাটন, পরীবাগ, বনশ্রী, যাত্রাবাড়ী ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন কক্ষের ফ্ল্যাটের ভাড়া এলাকাভেদে ১৮ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে ৩ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। তবে মূল সড়ক থেকে দূরে, যেমন মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় দুই কক্ষের ফ্ল্যাট পাওয়া যায়।

শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা আহসান হাবিব গত পাঁচ বছর ধরে একই বাসায় আছেন। এই সময়ে তাঁর বাসাভাড়া দুবার বেড়েছে এবং আগামী জানুয়ারি থেকে আরও এক হাজার টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন বাড়িওয়ালা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটের মধ্যে কোনো লিখিত চুক্তি না থাকায়, মৌখিক নির্দেশেই যখন-তখন ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ভাড়াটেদের।

বিবিএসের ২০২২ সালের খানার আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, দেশের একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৪২২ টাকা এবং গড় ব্যয় ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। ব্যয়ের ৪২ শতাংশ যায় খাদ্য কিনতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের খাত হলো বাসাভাড়া এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানুষ মূলত কাজের খোঁজে ঢাকায় আসেন। ঢাকার বাইরে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হলে অনেকেই ঢাকার বাইরে থাকতে পারতেন, যা রাজধানীতে বসবাসের চাপ কমাত এবং বাড়িভাড়াও নিয়ন্ত্রণে রাখত।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo