কুমিল্লার আতঙ্ক ‘আর স্কোয়াড’ প্রধান রতন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার

Published: October 3, 2026, 5:18 pm

কুমিল্লা নগরের ত্রাস ও আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘আর স্কোয়াড’ (যা ‘র (Raw) স্কোয়াড’ বা ‘রতন গ্রুপ’ নামেও পরিচিত) প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনকে (২৫) তাঁর প্রধান সহযোগীসহ কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করেছে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল শুক্রবার চালানো এক অভিযানে রতনের সঙ্গে তাঁর ‘ডান হাত’ হিসেবে পরিচিত ২০ বছর বয়সী সহযোগী সাইফুল ইসলামকেও গ্রেপ্তার করা হয়। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রতনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ৯টি এবং সাইফুলের বিরুদ্ধে ১০টি মামলা রয়েছে।

এই গ্রেপ্তারের পাশাপাশি কুমিল্লা জেলা পুলিশ কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে। শুক্রবার রাতে পরিচালিত পুলিশের পঞ্চম দফার অভিযানে মোট ৩৭০ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে ২৭৯ জনকে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হলেও বাকি ৯১ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই ৯১ জনের মধ্যে ‘ক্রাইম সেটআপ’ নামের আরেকটি কিশোর গ্যাংয়ের শীর্ষ নেতা মো. সাব্বির ওরফে ‘পয়েন্ট সাব্বির’ (২৪) ও তাঁর সহযোগী রবিউল ইসলাম নবী ওরফে ‘কিং মেকার’ (২৪) রয়েছেন।

কুমিল্লা নগরে ২০১৫ সালের পর থেকে ‘গ্যাং কালচার’ বা কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ছড়িয়ে পড়ে। শুরুর দিকে যে কয়েকটি গ্রুপ আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল, তার মধ্যে ‘আর স্কোয়াড’ অন্যতম। তবে ২০২২ সালে একটি প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের পর রতন গ্রুপ ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। ওই বছরের ১৯ আগস্ট কুমিল্লা নগর উদ্যানের সামনের সড়কে আওয়ার লেডি অব ফাতিমা স্কুলের সামনে ১৭ বছর বয়সী কিশোর শাহাদাত হোসেনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। র‍্যাব তখন জানিয়েছিল, রতন গ্রুপ ও ইগল গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। শাহাদাত হত্যা মামলায় রতনকে প্রধান আসামি করা হয় এবং পরবর্তীতে পুলিশ, র‍্যাব ও ডিবির অভিযানে মোট ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর থেকেই কুমিল্লায় রতন গ্রুপের নাম স্থায়ীভাবে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার, সংঘর্ষ, অস্ত্রের মহড়া, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে।

গত ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল নগরের ধর্মসাগরপাড়ের রানীর কুঠি এলাকায় নাফিজ অময় নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটে, যেখানে তাঁর একটি হাত প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ওই মামলায় রতন ও সাইফুলসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ জনকে আসামি করা হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, রতন ও সাইফুলের নেতৃত্বে ৩০-৪০ জনের একটি দল নাফিজের ওপর হামলা চালিয়েছিল। এর পরপরই ২৫ এপ্রিল নগরের রানীর দিঘির পাড়, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে অস্ত্রের মহড়া চলে। পরদিন ২৬ এপ্রিল রাতে র‍্যাব ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে রতনসহ ১৮ জনকে অস্ত্র ও মাদকসহ গ্রেপ্তার করা হয়। তবে কয়েক মাস পর জামিনে বের হয়ে রতন আবারও এলাকায় সক্রিয় হন। পুলিশ তাঁকে ধরতে একাধিকবার অভিযান চালালেও তিনি পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যান।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রতন আত্মগোপনে থাকলেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাইফুলের মাধ্যমে গ্রুপের কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করছিলেন। রতন ও তাঁর সহযোগীদের বারবার গ্রেপ্তারের পরও এই নেটওয়ার্ক কীভাবে টিকে থাকে, তা নিয়ে কুমিল্লাবাসীর মনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সচেতন নাগরিকেরা বলছেন, নেতা গ্রেপ্তার বা আত্মগোপনে গেলে তাঁর সহযোগীরা গ্রুপের হাল ধরে এবং নতুন সদস্য সংগ্রহ করে। এছাড়া অপরাধীদের জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তাদের ওপর নজরদারির অভাব এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতাও এর অন্যতম কারণ। সম্প্রতি কিশোর গ্যাং নেতা রতনের সঙ্গে এক ছাত্রদল নেতার ফোনালাপও প্রকাশ্যে এসেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়ছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি নিজেদের পেশিশক্তি বাড়াতে অতীতেও এসব গ্যাং ব্যবহার করেছেন এবং বর্তমানেও তা দেখা যাচ্ছে।

এই বিষয়ে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা তথাকথিত ‘বড় ভাই’ যদি এসব গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo