বর্ষা গেলেও নামেনি পানি, ভবদহে পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ

Published: October 3, 2026, 3:22 am

বর্ষাকাল শেষ হওয়ার দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও যশোরের ভবদহ অঞ্চলের অন্তত ২০০টি গ্রাম থেকে এখনও পানি নামেনি। গত তিন মাস ধরে পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন এসব এলাকার লক্ষাধিক মানুষ। বাড়িঘর, ফসলি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে থাকায় অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছেন। দীর্ঘ চার দশক ধরে চলা এই স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে আবারও আন্দোলনে নেমেছেন ভুক্তভোগীরা।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি আগামী ৫ অক্টোবর 'ভবদহ দিবস' উপলক্ষে পদযাত্রা ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি যশোর শহরের ভোলা ট্যাংক রোডে সংগঠনের অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক গাজী আবদুল হামিদ। সংবাদ সম্মেলনে তিনি ভবদহ অঞ্চলের স্থায়ী জলাবদ্ধতা দূর করতে আগামী মাঘী পূর্ণিমার আগেই কার্যকর জোয়ারাধার ব্যবস্থাপনা (টিআরএম) চালুর জোর দাবি জানান।

যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার নিম্নাঞ্চল নিয়ে ভবদহ অঞ্চল গঠিত। অভয়নগরের ভবানীপুর গ্রামে শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ২১ ভেন্টের ভবদহ স্লুইসগেট দিয়ে ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশিত হয়ে থাকে। তবে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদীসহ স্থানীয় বিভিন্ন নদ-নদীতে দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে গত জুলাই মাসের টানা বৃষ্টির পর বিল উপচে আশপাশের গ্রামগুলো প্লাবিত হয়, যা তিন মাসেও স্বাভাবিক হয়নি।

জলাবদ্ধতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম। অভয়নগরের সুন্দলী ইউনিয়নের ডহর মশিয়াহাটী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ডহর মশিয়াহাটী নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মনিরামপুরের কুলটিয়া ইউনিয়নের বাজে কুলটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এখনও পানি জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও জমেছে কচুরিপানা, যার ফলে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া ফসলি জমি ও উপাসনালয় তলিয়ে থাকায় এবং দীর্ঘদিনের পানিবন্দি দশার কারণে স্থানীয় বহু পরিবার খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর তীব্র সংকটে পড়েছে।

সংগ্রাম কমিটির দাবি, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে জোয়ারের পানির প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে বিলে পলি জমানোর প্রক্রিয়া বা টিআরএম চালু করা জরুরি। গাজী আবদুল হামিদ জানান, বর্তমানে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১ কিলোমিটার নদী সংস্কারের কাজ চললেও টিআরএম চালু না হলে এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। নদী খননের পর আবারও দ্রুত পলি জমে তা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তাই ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) প্রস্তাবনা অনুযায়ী দ্রুত একটি বিলে টিআরএম চালু এবং আমডাঙ্গা খাল পুনঃখনন ও প্রশস্ত করার দাবি জানান তিনি। এছাড়া নদী-খাল থেকে কচুরিপানা, নেট-পাটা ও কৃত্রিম বাঁধ অপসারণ এবং ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবরের আন্দোলনে পুলিশের হামলার বিচারের দাবিও জানানো হয়。

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানান, ছয়টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ চলমান রয়েছে। এবার ভবদহ বিলে পানি প্রায় তিন ফুট বৃদ্ধি পেয়েছিল। বর্তমানে ২১ ভেন্টের ভবদহ স্লুইসগেটের সব কটি কপাট খোলা রয়েছে এবং তা দিয়ে পানি বের হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, খুব দ্রুতই পানি নেমে যাবে। তবে প্রতি বছর বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতা ও পানি নামার অপেক্ষার এই চক্র থেকে স্থায়ী মুক্তি চান ভবদহের বাসিন্দারা।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Dainik Amader Shomoy