সমাজে টেকসই শান্তি ও সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য অপরাধের বিচারের পাশাপাশি জাতীয় পুনর্মিলন বা রিকনসিলিয়েশন অপরিহার্য। তা না হলে সমাজ দীর্ঘ মেয়াদে গভীরভাবে বিভক্ত থেকে যায়। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর শেষ দিনে ‘ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও জাতীয় পুনর্মিলন’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তারা এ কথা বলেন। সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে এই অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকা, কম্বোডিয়া, ভারত ও নেপালের শিক্ষক ও গবেষকেরা এতে অংশ নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেন।
অধিবেশনে প্রধান আলোচকদের একজন, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বিশ্বজুড়ে অনেক সময় রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হতে দেখা যায়। কারণ এটিকে অনেক সময় রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সাথে জড়িতদের আইনি শাস্তি থেকে বাঁচানোর রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিচারহীন জাতীয় রিকনসিলিয়েশন কোনো প্রকৃত শান্তি আনতে পারে না, তা কেবল সংঘাতের মাঝে সাময়িক বিরতি মাত্র। জাতিসংঘের প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৬০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশই ছিল শিশু। এই নির্ভীক ও আপসহীন প্রজন্ম একটি বৈষম্যহীন নতুন দেশ গড়ার লড়াইয়ে জীবন দিয়েছে, যেখানে সবার সমান অধিকার থাকবে এবং অপরাধীদের বিচার হবে।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল আরও বলেন, অপশক্তিগুলো এখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পেতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত, দেশ-বিদেশের কিছু পক্ষ রিকনসিলিয়েশনের দোহাই দিয়ে তাদের পক্ষে সাফাই গাইছে, যা দেশকে নতুন ও ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন, ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে রিকনসিলিয়েশনের কোনো সুযোগ নেই। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান দলের প্রতিবেদনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হওয়ার প্রাক্কলন করা হয়েছে, অন্যদিকে সরকারি তালিকায় শহীদের সংখ্যা ৮৪৩ জন।
নেপাল ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারনেশনাল কো-অপারেশন অ্যান্ড এনগেজমেন্টের গবেষণা পরিচালক প্রমোদ জয়সওয়াল অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার প্রয়োজন, তবে রিকনসিলিয়েশন ছাড়া সমাজ বিভক্তই থেকে যাবে। তিনি আরও যোগ করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় জবাবদিহিকে প্রায়ই প্রতিশোধের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, যা ঠিক নয়। রিকনসিলিয়েশন মানে অতীত নিয়ে সম্পূর্ণ একমত হওয়া বা গুরুতর অপরাধকে ক্ষমা করা নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে সব সম্প্রদায় মর্যাদার সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে, ঐতিহাসিক ক্ষোভকে স্বীকৃতি দিতে পারে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা পুনর্গঠন করতে পারে।
অধিবেশনে ভারতের রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কারোরি সিং বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশ যেমন শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের স্বেচ্ছাচারিতাই মূলত সমস্যার সৃষ্টি করছে। দক্ষিণ আফ্রিকার উইটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাদালিৎসো জিলিলো ফিরি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় গঠিত ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন নতুন সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত হলেও উদারনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাম্যের সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারায় তা সমালোচিত হয়েছিল। অন্যদিকে, কম্বোডিয়ার সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক নিকি সিঙ্গার জানান, ১৯৯১ সালের আগেই কম্বোডিয়ায় রিকনসিলিয়েশন শুরু হয় এবং ১৯৯৮ সালে খেমার রুজ সৈন্যদের নিরস্ত্রীকরণ করে মূল স্রোতে ফেরানো হয়। কম্বোডিয়ার মানুষ অতীতের দোষারোপের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর ঐতিহ্যের কথা ভাবেন।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর অধিবেশনে বলেন, ১৯৭১ সালের অপরাধকারীরা এখনো অপরাধ স্বীকার করেনি, উল্টো তারা তাদের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাতরত পক্ষগুলোর মধ্যে এখনো উগ্র জাতীয়তাবাদী অবস্থান বিদ্যমান। এমনকি ২০২৪ সালে গণতন্ত্রকামী আন্দোলনকারীদের যারা হত্যা করেছিল, তাদের মাঝেও কোনো অনুশোচনা নেই; বরং তারা আন্দোলনকারীদের চরমপন্থী বলে আখ্যা দিচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, টেকসই সমাজ গঠনে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে তাদের ভুল বোঝাতে হবে। তবেই সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে নতুন যাত্রা শুরু করা সম্ভব।





