উপকূলের পানির সংকটে আর্সেনিক ও সিসার ঝুঁকি, ঘরেও জীবাণু

Published: October 8, 2026, 10:12 am

সুন্দরবন-সংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলার গোবরা গ্রামে কামরুল ইসলামের বাড়ির ছাদ থেকে একটি পাইপ নেমেছে পানির ট্যাংকে। বর্ষায় ছাদে পড়া পানি ওই পাইপ দিয়ে ট্যাংকে জমা হয়। সেই পানি রান্না, খাওয়া ও পরিবারের অন্যান্য কাজে ব্যবহার করেন তাঁরা। কামরুল ইসলাম বলেন, এখানে মিঠাপানির খুব কষ্ট। বর্ষার সময় বৃষ্টি হলে যতটা সম্ভব পানি ধরে রাখি। একবার ট্যাংক ভরে গেলে সেই পানি পাঁচ-ছয় মাস চলে। অনেক সময় পাঁচ-ছয় মাস পরও ট্যাংকের পানি শেষ হয় না। তিনি আরও বলেন, পানি পরিষ্কার দেখলে আমরা খেয়ে নিই। জীবাণু তো চোখে দেখা যায় না। কখনো পানি পরীক্ষা করাইনি। নিয়ম করে ট্যাংক পরিষ্কার করা হয় না। পানি শেষ হলে বা ভেতরে ময়লা দেখা দিলে পরিষ্কার করা হয়। পরিবারের সদস্যদের মাঝেমধ্যে পেটের সমস্যা, পাতলা পায়খানা বা বমি হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে পানির মানের সর্বশেষ বড় চিত্র পাওয়া যায়। জরিপটি হয়েছে ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন। এতে ৬১ হাজার ২০৭টি পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় এবং ৬ হাজার ১০৬টি পরিবারের পানির গুণমান পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় খুলনা বিভাগের ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের ব্যবহৃত উৎসের পানিতে ই কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। ঘরে পান করা অবস্থায় এই জীবাণু ছিল ৯২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষের পানিতে। গবেষকেরা বলছেন, উৎস থেকে পানি সংগ্রহ, বহন ও সংরক্ষণের পথে দূষণ ঘটতে পারে।

খুলনা বিভাগের ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষের উৎসের পানিতে আর্সেনিক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত সীমার (প্রতি লিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম বা ১০ পিপিবি) চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রাম সীমার বেশি ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের উৎসে। একই জরিপে খুলনা বিভাগের ১০ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের উৎসে মাঝারি এবং ৩ দশমিক ৮ শতাংশের উৎসে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। উন্নত উৎস বাড়ির প্রাঙ্গণে থাকা, প্রয়োজনের সময় পানি পাওয়া, উৎসের পানি ই কোলাইমুক্ত হওয়া এবং আর্সেনিক ১০ পিপিবির মধ্যে থাকা—এই শর্তগুলো একসঙ্গে ধরলে খুলনা বিভাগের মাত্র ১৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ নিরাপদ ব্যবস্থাপনার খাওয়ার পানির আওতায়। বাংলাদেশের ৫০ পিপিবি আর্সেনিক মান ধরলে হারটি ২০ দশমিক ১ শতাংশ।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের খুলনা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শামীম আহমেদ বলেন, লবণাক্ততা ও আর্সেনিক—দুটিই বড় সমস্যা। খুলনার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা; বাগেরহাটের মোংলা, রামপাল ও মোরেলগঞ্জ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনিতে নিরাপদ পানির সংকট বেশি। সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম মোড়ল আর্সেনিকজনিত ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁর বাবা, মা, স্ত্রী, দাদি, চাচিসহ পরিবারের অনেক সদস্য আর্সেনিকজনিত অসুস্থতায় মারা গেছেন। শফিকুল বলেন, বিভিন্ন সময়ে সরকার পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে, কিন্তু তা অপ্রতুল। কোথাও পানি লবণাক্ত, আবার কোথাও নিরাপদ পানি আনতে যেতে হয় অনেক দূরে।

খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগরের ৩৯টি ইউনিয়ন নিয়ে ইউটিলিটিজ পলিসি সাময়িকীতে ২০২৬ সালে প্রকাশিত গবেষণাটির জন্য ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬৬ হাজার ২৩৪টি পরিবারের তথ্য নেওয়া হয়। গবেষকেরা ৬৬৬টি কমিউনিটি নলকূপ ও ২২৪টি পুকুরের পানির লবণাক্ততা পরীক্ষা করেন। নলকূপের পানিতে গড় মোট টিডিএস ছিল প্রতি লিটারে ১ হাজার ৭৩৩ মিলিগ্রাম; পুকুরে ছিল ১ হাজার ৩৩০ মিলিগ্রাম। ৫ উপজেলায় বছরে গড়ে ৪ দশমিক ৬৫ মাস নির্ভরযোগ্য পানি পাওয়া যায় না। পাইকগাছায় সময়টি ৭ দশমিক ১৫ মাস, কয়রায় ২ দশমিক ৮৪ মাস। পরিবারে মাত্র ১৬ শতাংশের নিজস্ব খাওয়ার পানির উৎস আছে। প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবারে পানি আনার দায়িত্ব নারী ও কিশোরীদের। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে মাসিক আয়ের সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ খাওয়ার পানির পেছনে ব্যয় করতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের প্রভাষক তাসনিম চৌধুরী ফাহিম বলেন, এক ঘড়া পানি আনতে উপকূলের নারীদের কমপক্ষে দেড় ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী এলাকার বাসিন্দা সরস্বতী মুন্ডা জানান, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক পাওয়ায় তাঁর কষ্ট কমেছে। তবে দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নে করা নতুন একটি গবেষণা, যা এনভায়রনমেন্ট, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি সাময়িকীতে গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়েছে, দেখিয়েছে যে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ঠিক না হলে এই পানিও ঝুঁকিমুক্ত নয়। ১১৬টি পরিবারের ওপর জরিপ চালিয়ে ৪৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয় ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে। সব ধরনের সংরক্ষণব্যবস্থায় মলজাতীয় কলিফর্ম গ্রহণযোগ্য সীমার ওপরে ছিল। সিসা পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক শূন্য ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৩৩ মিলিগ্রাম। ড্রাম বা কলস, ব্যক্তিগত ট্যাংক ও আরসিসি ট্যাংকের গড় নমুনায় সিসা ডব্লিউএইচও ও বাংলাদেশের মানের বেশি। গবেষকেরা বলছেন, ছাদে ব্যবহৃত সিসাযুক্ত রং, পুরোনো পাইপ বা পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণব্যবস্থার উপকরণ ভূমিকা রাখতে পারে। জরিপে ৫৯ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, পান করার আগে তারা পানি পরিশোধন করে না। পানি পরিশোধন না করা পরিবারে ডায়রিয়ার আশঙ্কা ২ দশমিক ৪১ গুণ এবং পেটের অন্য সমস্যার আশঙ্কা ২ দশমিক ১৮ গুণ বেশি।

দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সুদীপ বালা বলেন, মার্চ থেকে মে মাসে হাসপাতালে পানিবাহিত রোগী বেশি আসে। এছাড়া আইসিডিডিআরবি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ গবেষণায় খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনির ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জনের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। তাঁদের ২১ দশমিক ৬ শতাংশের আগামী ১০ বছরে হৃদ্‌রোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অন্তত ১০ শতাংশ। আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলিয়া নাহিদ বলেন, খাওয়ার পানিতে লবণাক্ততা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির উচ্চ হার গবেষণায় উঠে এসেছে, তবে এটি সরাসরি কারণ কি না তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo