ফিনটেক খাতে এআইয়ের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে রাজধানীতে সামিট

Published: October 12, 2026, 1:57 pm

২০২৩ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে ফিনটেক বা আর্থিক প্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। গ্রাহকসেবা থেকে শুরু করে আর্থিক ধারণার মূলে পরিবর্তন আনছে এই প্রযুক্তি। বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বে এআই নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, যার ফলে বাংলাদেশের ফিনটেক খাতেও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। গত শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত বাংলাদেশ ফিনটেক সামিটের ষষ্ঠ সংস্করণে এসব তথ্য উঠে আসে। বাংলাদেশ ফিনটেক ফোরামের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের আয়োজনে দিনব্যাপী এই সম্মেলনে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ, নগদবিহীন লেনদেন, ডিজিটাল আর্থিক খাতের রূপান্তর এবং প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবার সম্প্রসারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী সম্পাদক সাজিদ মাহবুব সম্মেলনে বলেন, বাংলাদেশের ফিনটেক খাতের অগ্রগতি নির্ভর করছে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারকে আমরা কতটা স্থায়ী আর্থিক সক্ষমতায় রূপ দিতে পারি তার ওপর। উদ্ভাবনের মাধ্যমে আর্থিক সেবাকে মানুষের জন্য আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করার পাশাপাশি এসব সেবার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। এ জন্য প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করে ভবিষ্যতের আর্থিক সেবার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও মান গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

র‍্যাপটাসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বাংলাদেশে মাইক্রোসফটের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুপ ফারুক ফিনটেক শিল্পে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, মানুষের নজরদারি ও সুনির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ফিনটেক খাতে এআই যেভাবে লেনদেন ও মূল ব্যবসায়িক প্রভাব ফেলছে, তা সার্বক্ষণিক তদারকি করা জরুরি। গ্রাহকের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল আর্থিক তথ্য যেন কোনো অননুমোদিত এআই এজেন্ট হাতিয়ে নিতে না পারে, তার জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। বিশেষ করে ঋণ-ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কেওয়াইসি যাচাইকরণের মতো অতিসংবেদনশীল কাজে এআই যেন কোনো ভুল বা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত না নেয়, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য এআই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ট্রান্সফাই গ্লোবালের প্রধান ব্যাংকিং ও নেটওয়ার্ক কর্মকর্তা নওশাদ হুসেইন জানান, আসিয়ান ও দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে, যা নতুন গ্রাহক ও বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে ফিনটেক খাত সুপার অ্যাপ, ডিজিটাল ওয়ালেট, নিয়মে বাঁধা ডিজিটাল ব্যাংক ও পেমেন্ট পরিকাঠামোর মতো বিভিন্ন মডেলে এগোচ্ছে। বিভিন্ন সুপার অ্যাপ দৈনন্দিন সেবার সঙ্গে ব্যাংকিং, সঞ্চয়, ঋণ ও বিনিয়োগ যুক্ত করে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বড় বিপ্লব এনেছে।

কিউব মানি ইউকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী ইয়ার মোহাম্মদ বলেন, গ্রাহকদের দ্রুত পরিবর্তনশীল চাহিদা মেটাতে ও ডিজিটাল ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে ব্যাংকগুলোকে ডিজিটাল চিন্তাধারাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এখানে মূল চাবিকাঠি হলো গ্রাহক অভিজ্ঞতার জন্য নিরবচ্ছিন্ন অ্যাপ সেবা, দ্রুত ঋণ অনুমোদন এবং ২৪/৭ সমর্থন নিশ্চিত করা। ফিনটেক ও ডিজিটাল ব্যাংক পরিচালন খরচ কমিয়ে এসএমই ঋণ সম্প্রসারণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছাতে অনন্য ভূমিকা রাখছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ফিনটেক খাতের টেকসই অগ্রগতির জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। আর্থিক জালিয়াতি শনাক্ত, ঋণ মূল্যায়ন ও বিমা সেবায় এআই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে, তবে এর জন্য প্রশাসনিক জবাবদিহি ও মানব পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য।

সম্মেলনে আর্থিক সেবার মানোন্নয়ন, আরও বেশি মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং দেশের ডিজিটাল আর্থিক খাতের অগ্রগতিতে অবদান রাখা ২১টি ফিনটেক উদ্যোগকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ফিনটেক উদ্ভাবনের মূল্য নির্ভর করে তা মানুষ ও ব্যবসার জন্য কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে তার ওপর। আর্থিক সেবাকে আরও সহজলভ্য, নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর করতে যেসব দল কাজ করছে, এই সম্মাননা তাদের প্রচেষ্টার স্বীকৃতি। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, তাদের এই অর্জন মানুষের বাস্তব প্রয়োজন মেটাতে পারে এমন নতুন ধারণায় বিনিয়োগ বাড়াবে এবং বাংলাদেশের আর্থিক ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo