যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক তোড়জোড় চলছে। এবারের নির্বাচনে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সর্বমোট ৪৩৫টি আসনে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশটির ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে নতুন গভর্নর নির্বাচনের ভোটও সম্পন্ন হয়েছে। এই নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় জায়গাতেই ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন।
নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশটির ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে আলোচনা সব সময়ই তুঙ্গে। ১৯৪৬ সালের ১৪ জুন নিউইয়র্কের কুইন্সে জন্ম নেওয়া ট্রাম্প ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেন। রাজনীতিতে আসার আগে বহু বছর ধরে তিনি মূলত এক ধনকুবের ব্যবসায়ী ও শোবিজ ব্যক্তিত্ব হিসেবে মার্কিন সমাজে পরিচিত ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর কোনো উল্লেখযোগ্য সক্রিয়তা ছিল না। অতীতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়াইয়ের গুঞ্জন থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মাঠে নামেননি। তবে ২০১৫ সালের ১৫ জুন হঠাৎ করে প্রেসিডেন্ট পদে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। শুরুতে তাঁর এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই গুরুত্ব দেননি এবং হরেক রকম হাসিঠাট্টা হলেও তিনি নিজের লক্ষ্যে অনড় থেকে পুরো ব্যবসায়ী থেকে পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদে রূপ নেন।
পারিবারিক ও শিক্ষাজীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ট্রাম্প ছিলেন চতুর্থ। তাঁর বাবা ফ্রেড ট্রাম্প ছিলেন নিউইয়র্কের সফল আবাসন ব্যবসায়ী এবং মা মেরি ট্রাম্প ছিলেন স্কটিশ বংশোদ্ভূত মার্কিন। ছোটবেলায় চঞ্চল ও দুরন্ত স্বভাবের হওয়ায় তাঁকে নিউইয়র্ক মিলিটারি অ্যাকাডেমি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ারটন স্কুল থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন ট্রাম্প। বাবার বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানে একদম শিক্ষানবিশ পদ থেকে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে পারিবারিক ব্যবসাকে আরও বড় করে তোলেন এবং ক্রমান্বয়ে হোটেল, বহুতল ভবন, গলফ কোর্স ও ক্যাসিনো গড়ে তোলেন।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি দীর্ঘদিন মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতার স্পনসর ছিলেন ট্রাম্প। এ ছাড়া 'দ্য অ্যাপ্রেনটিস' নামের জনপ্রিয় টিভি রিয়্যালিটি শো উপস্থাপনা করে তিনি রাতারাতি তারকাখ্যাতি পান, এমনকি রেসলিং ম্যাচও উপস্থাপনা করেছেন। ক্যারিয়ারজুড়ে তিনি যেমন বহু মামলার মুখোমুখি হয়েছেন, তেমনি মামলা ঠুকেছেন এবং বেশ কয়েকবার নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে ট্রাম্প তিনবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং তিনি পাঁচ সন্তানের জনক। তাঁর প্রথম স্ত্রী চেক মডেল ইভানার সঙ্গে ১৯৯২ সালে বিচ্ছেদ হয়। ১৯৯৩ সালে তিনি বিয়ে করেন মার্লা ম্যাপলসকে, যাঁর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে ১৯৯৯ সালে। এরপর ২০০৫ সালে মডেল মেলানিয়াকে বিয়ে করেন তিনি, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি।
রাজনীতিতে দল বদলের পর অবশেষে রিপাবলিকান পার্টির সদস্য হিসেবেই নিজের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যান ট্রাম্প। পুরো প্রচারণাজুড়ে তিনি বিতর্ক ও আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। রাশিয়া ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি প্রকাশ্য অনুরাগ জানানোর পাশাপাশি অভিবাসী, মুসলিম, নারী এবং জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে তাঁর নেতিবাচক অবস্থান তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে অশালীন আচরণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগও ওঠে। এসব বিতর্ক সত্ত্বেও ১৬ জন দলীয় প্রার্থীকে পেছনে ফেলে রিপাবলিকান মনোনয়ন ছিনিয়ে নেন তিনি। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিলারি ক্লিনটনকে পরাজিত করে সবাইকে চমকে দিয়ে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাম্পকে জেতাতে রুশ হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে তদন্ত চলছে। ক্ষমতায় আসার পরও বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি; মুসলিম দেশগুলোর ওপর ভ্রমণনিষেধাজ্ঞাসহ একের পর এক বিতর্কিত নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন তিনি। ঘনঘন টুইট করা এবং সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে দৈনন্দিন সংঘাতের কারণে তাঁর মানসিক সুস্থতা নিয়েও নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। প্রথম বছরেই প্রশাসনের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা দায়িত্ব ছেড়ে যান। তাঁর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি বিশ্বজুড়ে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে। এসব সমালোচনা ও প্রশাসনিক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়াইয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করে রেখেছেন।
prothomalo-bangla/2026-03-22/7y61su0m/us-house.webp
prothomalo-bangla/2026-11-04/abk4l5l9/us-result.jpg





