সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর সময় আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে চিরচেনা ঘুমপাড়ানি ছড়াটি গেয়ে আসছি, তার প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের এক করুণ আখ্যান। ‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে?’—এই ছড়ার শুরুতে যে ‘বর্গি’র কথা বলা হয়েছে, তারা মূলত মারাঠা অশ্বারোহী বাহিনীর একটি অংশ। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাংলার শাসনকর্তা নবাব আলিবর্দি খাঁর শাসনামলে নাগপুরের মারাঠা শাসক রঘুজি ভোসলের নেতৃত্বে এই বাহিনী বাংলায় ধারাবাহিক অভিযান চালায়। মারাঠা অশ্বারোহী বাহিনীর এই সৈন্যদের ‘বারগির’ বলা হতো, যা বাংলায় ‘বর্গি’ নামে পরিচিতি পায়। সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিত ছিলেন এই অভিযানের অন্যতম প্রধান সংগঠক।
১৭৪২ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত প্রায় এক দশক ধরে বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, হুগলি ও মেদিনীপুরসহ বাংলার বিস্তীর্ণ জনপদে বর্গিরা লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। দ্রুতগতির এই অশ্বারোহী বাহিনী হঠাৎ গ্রামে ঢুকে কৃষকের ফসল, তাঁতির কর্মশালা কিংবা ব্যবসায়ীর দোকান লুণ্ঠন করত। প্রাণ ও সম্পদ বাঁচাতে সাধারণ মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল। বর্গি আক্রমণের আতঙ্ক এতটাই প্রবল ছিল যে, ১৭৪২ সালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতার চারপাশে একটি পরিখা খননের উদ্যোগ নেয়, যা ইতিহাসে ‘মারাঠা ডিচ’ নামে পরিচিত।
ছড়ার পরের অংশ ‘বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে?’—এটি তৎকালীন কৃষিনির্ভর মানুষের চরম অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। ফসলহানি, লুটপাট এবং খাজনার চাপে সাধারণ মানুষের জীবন কতটুকু দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, তা এই লোকছড়ার ভাষায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। দীর্ঘ সামরিক প্রতিরোধের পর ১৭৫১ সালে নবাব আলিবর্দি খাঁ মারাঠাদের সঙ্গে সন্ধি করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে উড়িষ্যার ওপর মারাঠাদের অধিকার স্বীকার এবং বার্ষিক চৌথ প্রদানের বিনিময়ে বাংলায় বর্গি আক্রমণের দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
তবে সন্ধি হলেও সাধারণ মানুষের হারানো ভিটেমাটি বা স্বজনদের স্মৃতি ফিরে আসেনি। লোকসাহিত্যের এই ছড়াটি কেবল বিনোদন নয়, বরং ইতিহাসের এক জীবন্ত সংরক্ষণাগার হয়ে উঠেছে। এটি রাজা-নবাবদের ক্ষমতার লড়াইয়ের চেয়ে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি, উদ্বাস্তু মানুষের দীর্ঘশ্বাস এবং মায়ের উৎকণ্ঠার প্রতিচ্ছবি বেশি ফুটিয়ে তোলে। শত বছর পেরিয়ে গেলেও এই ছড়াটি ইতিহাসের সেই ক্ষত ও আতঙ্কের স্মৃতি বহন করে চলেছে, যা মনে করিয়ে দেয় যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার রেশ দীর্ঘস্থায়ী হয়।
তা জায়গা করে নিয়েছে বাংলার লোকসাহিত্যে, বিশেষ করে শিশুকে ঘুম পাড়ানোর ছড়ায়।.দীর্ঘ জীবন পেতে মানুষকে সহায়তা করতে পারে ১৯৪ বছর বয়সী কচ্ছপ!.‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো’—এই বাক্যে একদিকে যেমন ঘুমন্ত শিশুর শান্ত পৃথিবী, অন্যদিকে ‘বর্গি এলো দেশে’ কথাটিতে তৎকালীন মানুষের নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি।ছড়ার পরের লাইন ‘বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে?’— এখানেও ধরা পড়ে কৃষিনির্ভর মানুষের অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত।





