সরকার আশঙ্কা করছে যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত দেশে ক্রমাগত অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চক্রান্ত বা অপচেষ্টা চলতে পারে। তবে এই ধরনের যেকোনো ষড়যন্ত্র কঠোর হস্তে প্রতিহত করা হবে বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি জানাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব মন্তব্য করেন। এ সময় তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে চলমান পোশাক খাতের অসন্তোষ ও শ্রমিকদের আন্দোলন প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে উপদেষ্টা বিগত বছরগুলোর মজুরি পুনর্নির্ধারণের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০০৬, ২০১০, ২০১৩, ২০১৮ এবং ২০২৩ সালে গার্মেন্টস কর্মীদের মজুরি পর্যালোচনা করে নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর পর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের নিয়ম থাকায় ২০২৬ সালে পরবর্তী বোর্ড তৈরির কথা ছিল। কিন্তু নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির মতো জীবনযাত্রার বৈরী পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রেখে সরকার আগেভাগেই সহানুভূতিশীল অবস্থান থেকে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। সরকার পোশাকশ্রমিকদের কঠিন জীবনযাপনের বাস্তবতা বুঝতে পেরেছে বলেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মাধ্যমে শ্রমিক আন্দোলনের মূল দাবির ইতি ঘটার কথা ছিল।
আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, কিছু মানুষের প্রকাশ পাওয়া হিংসাত্মক আচরণ কোনোভাবেই সাধারণ পোশাকশ্রমিকদের হতে পারে না। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যেই এসব ঘটনার সাথে সীমান্তের ওপারের যোগসূত্রের বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই মুহূর্তে মাঠে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার মতো শক্তি বা সক্ষমতা না থাকলেও, তাদের হাতে থাকা প্রচুর অর্থ ব্যবহার করে বিভিন্ন অঞ্চলে নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সরকার মনে করছে।
ডিসেম্বর মাসে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে আসার পথ প্রশস্ত করতেই এসব অস্থিরতা উস্কে দেওয়া হচ্ছে কি না—সংবাদদাতাদের এমন প্রশ্নের উত্তরে উপদেষ্টা স্পষ্ট করেন যে, বিষয়টি কেবল একটি নির্দিষ্ট মাস বা ডিসেম্বরকেন্দ্রিক নয়। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের পর পরাজয় মেনে নিতে না পেরে সংসদে দেওয়া শেখ হাসিনার সেই বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে উপদেষ্টা বলেন, সে সময় তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে নির্বাচিত সরকারকে একদিনের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেবেন না। সেই মনোভাবের প্রতিফলন এখনো অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করে উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত সরকারের বিরুদ্ধে এই অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলতে পারে এবং সরকার তা শক্ত হাতে প্রতিরোধ করবে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা সংক্রান্ত নিজের আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রদান করে উপদেষ্টা জানান, ডিসেম্বর মাস পার হওয়ার পর তিনি আবার বিষয়টিতে আলোকপাত করবেন। তবে যদি অলৌকিকভাবে শেখ হাসিনা দেশে চলে আসেন এবং তার আগের ব্যাখ্যা ভুল প্রমাণিত হয়, তবে তিনি পরবর্তী যেকোনো সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যে ভুল স্বীকার করার ঘোষণা দেন। উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনা এসে উপস্থিত হলে দায়িত্ব ও জীবনে বহাল থাকা সাপেক্ষে পরবর্তী মঙ্গলবারে সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি নিজের ভুল ব্যাখ্যার জন্য দুঃখ প্রকাশ করবেন।
আন্দোলন ও অস্থিরতা মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে উপদেষ্টা নিশ্চিত করেন যে, বর্তমান সরকার অতীতের মতো নির্মম দমন-পীড়নের পথে হাঁটা থেকে বিরত থাকবে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, "বাংলাদেশের পুলিশ কখনোই হাসিনার পুলিশের মতো আর হবে না।" একজন নাগরিক হিসেবে তিনি স্বীকার করেন যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বল প্রয়োগের আইনি একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে, কিন্তু সেই প্রয়োগ অবশ্যই আইনের সীমারেখার মধ্যে এবং পরিস্থিতির অনুপাতে হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোথাও কোথাও মাত্রাতিরিক্ত বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ বল প্রয়োগের চিত্র দেখতে পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, সাধারণ মানুষের ভয়ভীতি ও ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পোশাকশ্রমিকেরা দ্রুত আন্দোলন প্রত্যাহার করলে অপশক্তিগুলো পরিস্থিতি ঘোলাটে করার সুযোগ পাবে না বলেও তিনি বিশ্বাস করেন।





