ছোটবেলায় ছাত্রজীবনের রচনা লিখতে গিয়ে 'ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ' অর্থাৎ অধ্যয়নই শিক্ষার্থীদের তপস্যা বলে সূচনা করার প্রথা থাকলেও, সম্প্রতি প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেশের শিক্ষাঙ্গনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এ বছরের ফলাফলে গত ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় অবনতি পরিলক্ষিত হয়েছে। পরীক্ষা দেওয়া মোট সাড়ে ১০ লাখের মতো শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ৫ লাখ ৪০ হাজার জন, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই পরীক্ষায় ফেল করেছেন। একইভাবে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে; গত বছর যেখানে ৬৩ হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন, এবার সেই সংখ্যা অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৫ হাজারে। পাশাপাশি শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে এবং কেউ পাস করেনি এমন শূন্য-পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরো উচ্চশিক্ষা ও ভর্তি পরীক্ষায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই ধাপে এমন আশঙ্কাজনক ফলাফলের নেপথ্যে অবকাঠামোগত ত্রুটি, সঠিক পাঠদানের ঘাটতি, তীব্র শিক্ষকস্বল্পতা এবং পরীক্ষার সময় প্রতিকূল বৈরী আবহাওয়ার প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নানা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও পড়ালেখায় ভাটা পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। কোনো কোনো মহলের পরোক্ষ উৎসাহে কথায় কথায় আন্দোলনে যাওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অপরিণত বয়সে হাতে স্মার্টফোন আসা এবং প্রাথমিক স্তরের শিশুদের মধ্যেও মুঠোফোন আসক্তি ও স্বাস্থ্যঝাঁকি বৃদ্ধির ফলে শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছে অভিভাবকদের গাফিলতিতে গড়ে ওঠা কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ও তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, যার স্পষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলেই প্রতিফলিত হয়েছে।
রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও ইউনিভার্সেল নার্সিং কলেজ পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী জানান, অনেক বাবা-মায়ের দায়িত্বহীনতা, শৈথিল্য ও সন্তানকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়া তাদের স্বাভাবিক ছাত্রজীবনকে ব্যাহত করছে। ক্লাসে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অনুপস্থিতি ও শিক্ষাকার্যক্রমে তীব্র অনাগ্রহের বিষয়ে অভিভাবকদের জানানো হলে তাঁরা ইতিবাচক পদক্ষেপের বদলে উল্টো সন্তানের অছাত্রসুলভ আচরণের পক্ষ নেন। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে বাবার স্মৃতির উদ্দেশ্যে গত ১৫ বছর ধরে পরিচালিত 'আশুতোষ চক্রবর্ত্তী স্মারক শিক্ষাবৃত্তি'র অভিজ্ঞতাও শিক্ষার মানহীনতাকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। সেখানে স্থানীয় ১০ থেকে ১৫টি সেরা স্কুলের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির প্রথম স্থান অর্জনকারী ১০০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে প্রতিবছর মন্ত্রী বা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে জাতীয় পর্যায়ে সংবর্ধিত করা হয়। কিন্তু প্রকাশিত স্মরণিকা সম্পাদনার সময় দেখা গেছে, অনেক সেরা স্কুলের প্রথম স্থান লাভকারী শিক্ষার্থীও জিপিএ-৫ পায়নি, যা শিক্ষার সার্বিক মানের সংকটকে উন্মোচিত করে।
২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার এই চরম ফল বিপর্যয় কেবল শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাই দেখায় না, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশাজনিত আত্মহত্যার মতো মারাত্মক সামাজিক সংকটেরও জন্ম দিতে পারে। এত দিন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও এখন সামাজিক অবক্ষয় ও নজরদারির অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই ক্রান্তিলগ্নে কেবল সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে বা রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি পরিবার ও অভিভাবককে সন্তানের পড়ালেখায় সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। আগামী দিনে আলোকিত মানুষ দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়তে সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার জোর দাবি জানিয়েছেন ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী।





