কক্সবাজার সৈকতে পর্যটক মৃত্যু রোধে সমন্বিত নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলার তাগিদ

Published: November 2, 2026, 3:22 am

দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে এসে পর্যটকদের পানিতে ডুবে প্রাণ হারানোর ঘটনা নিত্যদিনের ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে সৈকতটিতে ৮৫ জন পর্যটকের মৃত্যু পর্যটন খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে মারাত্মক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এর মধ্যে কেবল গত ২১ অক্টোবর একই দিনে পাঁচজন পর্যটক প্রাণ হারান। শুধু সমুদ্রসৈকতেই নয়, গত আগস্টের অন্য এক প্রতিবেদনে উঠে আসে যে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে চার মাসে পাঁচজন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া অতি সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী এলাকার পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১০ জন পর্যটক প্রাণ হারান।

পরপর ঘটে যাওয়া এসব মর্মান্তিক ঘটনা বাংলাদেশের পর্যটন খাতের চরম অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার মারাত্মক ঘাটতিকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। এত বছর পার হওয়ার পরেও দেশের পর্যটন খাতে একটি স্থায়ী ও সমন্বিত সুরক্ষাবলয় গড়ে না ওঠা অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক। সৈকতে এসব প্রাণহানির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে পর্যটকদের অসচেতনতা ও প্রশাসনের সতর্কবার্তা না মানার প্রবণতা কাজ করছে। পর্যটকদের একটি বড় অংশ লাল নিশানায় চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা গুপ্তখালের স্থানগুলোকে উপেক্ষা করে সমুদ্রে নেমে পড়েন। সাঁতার না জেনেও লাইফ জ্যাকেট ছাড়া পানিতে নামা, জোয়ার-ভাটার সময় না মানা কিংবা বিকেল পাঁচটার পর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় সাগরে অবস্থান নেওয়ার মতো উদাসীনতা প্রাণহানির বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

বিশেষ করে সমুদ্রের তলদেশে তৈরি হওয়া গুপ্তখাল বা বড় গর্তের অবস্থান সম্পর্কে অনভিজ্ঞ পর্যটকদের কোনো ধারণাই থাকে না। তবে এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই যে, হোটেল বা রিসোর্টে ওঠার পর পর্যটকদের সচেতন করতে ডিজিটাল বার্তা, আগাম নিবন্ধন বা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কেন আজও গড়ে ওঠেনি।

পর্যটকদের অসচেতনতার পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও সমানভাবে দায়ী। অরক্ষিত সৈকতের বহু স্থানে পর্যাপ্ত উদ্ধারকারী নেই। কিন্তু দীর্ঘ চার যুগেও কক্সবাজার সৈকতে একজন ডুবুরি নিয়োগ না দেওয়ার তথ্যটি অবিশ্বাস্য। যেখানে প্রতিদিন কয়েক লাখ দর্শনার্থী সৈকতে নামেন, সেখানে পর্যটকের নিরাপত্তা কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় হতে পারে না।

কক্সবাজারসহ সব পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সৈকতজুড়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ লাইফগার্ড নিয়োগ, জরুরি উদ্ধারে আধুনিক সরঞ্জামসহ ডুবুরি দল পদায়ন এবং অরক্ষিত পয়েন্টগুলোতে কার্যকর নজরদারি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে হোটেলে অবস্থানকালে নিবন্ধনের সময় সচেতনতামূলক গাইডলাইন ও ডিজিটাল মেসেজ পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পর্যটন কেবল আয়ের উৎস হতে পারে না; ঘুরতে আসা মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় প্রশাসনের মৌলিক দায়িত্ব।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo