প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর: অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

Published: November 1, 2026, 6:15 am

রাষ্ট্রীয় সফরের সাফল্য কেবল চুক্তির সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না, বরং এর প্রকৃত প্রভাব মানুষের জীবনে কতটা পড়ছে তা অনুসন্ধান করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬–২৯ অক্টোবর জাপান সফরকেও এই মানদণ্ডে বিচার করা প্রয়োজন। সফরের দৃশ্যমান ফলাফলের মধ্যে রয়েছে ছয়টি সহযোগিতা দলিল এবং দুটি প্রকল্পের জন্য প্রায় ২৯ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি। এর মধ্যে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে ১০ কোটি ৮ লাখ ডলার এবং উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এছাড়া সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য ২১২ কোটি ইয়েন বা প্রায় ১ কোটি ৩৪ লাখ ডলার অনুদানের ব্যবস্থা হয়েছে। তবে ঋণ, অনুদান ও সহযোগিতার সমঝোতার পার্থক্য স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন, কারণ এদের আর্থিক দায় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ভিন্ন।

এই সফরের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ঋণের অঙ্কের বাইরে বিস্তৃত। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত পৌঁছানো এবং প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এটি একটি প্রক্ষেপণ মাত্র, তাই সরকারের দায়িত্ব হবে প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন, সময়সূচি ও অনুমোদনের অগ্রগতি পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা। সফরের অন্যতম দিক হলো বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে সম্প্রসারণ করা, যেখানে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। একটি বন্দর তখনই উৎপাদনশীল সম্পদ হয়, যখন কারখানা থেকে পণ্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে সেখানে পৌঁছাতে পারে। পরিবহন ব্যয় কমলে রপ্তানিকারক প্রতিযোগিতায় সুবিধা পান, নতুন শিল্প স্থাপনে আকর্ষণ বাড়ে এবং স্থানীয় ব্যবসাও বড় সরবরাহব্যবস্থার অংশ হতে পারে।

পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রে ইউনিক্লোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা একটি বাস্তব উদাহরণ, যেখানে তিনি কৃত্রিম তন্তু, বিশেষ কার্যোপযোগী বস্ত্র ও পরিবেশসম্মত পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো–অপারেশনের (জেবিআইসি) ঢাকায় কার্যালয় খোলার প্রস্তাবটি সম্ভাবনাময়, যা বড় শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সহায়ক হতে পারে। তবে এটি বর্তমানে একটি অনুরোধ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। পরবর্তী পদক্ষেপ হওয়া উচিত প্রস্তাবটির আনুষ্ঠানিক অনুসরণ এবং সম্ভাব্য অর্থায়নযোগ্য প্রকল্পের তালিকা তৈরি করা। উপজেলা পর্যায়ের উন্নয়নে ঋণের প্রতিশ্রুতিও গুরুত্বপূর্ণ, তবে এর সুফল পেতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প নির্বাচন, নাগরিকের মতামত গ্রহণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। একইভাবে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে সহযোগিতার সুযোগকে প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণব্যবস্থা, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে কাজে লাগানো গেলে ক্ষুদ্র উৎপাদকও উপকৃত হতে পারেন।

সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য টহল জাহাজের অনুদান উপকূলীয় সক্ষমতা বাড়ালেও, এর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বৃহত্তর কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সংরক্ষণ। সফর নিয়ে প্রচারে তথ্যের নির্ভুলতা জরুরি। কিছু প্রতিবেদনে সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করার যে কথা বলা হয়েছে, তা মূলত ২০২৩ সালের এপ্রিলে হয়েছে। এবারের সফর বিদ্যমান অংশীদারত্বের ওপর ভিত্তি করে সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের। বিনিয়োগ আহ্বানের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ দ্রুত কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে যৌথ বিবৃতিতে মানবিক সহায়তা ও প্রত্যাবর্তনের পক্ষে অবস্থান থাকলেও, নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুপস্থিত। সব মিলিয়ে, এই সফর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ। এখন সরকারের উচিত একটি প্রকাশ্য বাস্তবায়ন তালিকা তৈরি করা, যাতে ছয় মাস বা এক বছর পর এর সাফল্যের প্রমাণনির্ভর মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়। জাপানে অর্জিত আস্থা বাংলাদেশে দক্ষ প্রশাসন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানে রূপ নিতে পারলেই সফরটি দীর্ঘস্থায়ী গুরুত্ব পাবে। কূটনৈতিক সাফল্যের চূড়ান্ত প্রতিফলন মানুষের জীবনেই দৃশ্যমান হওয়া বাঞ্ছনীয়।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo